হোমপেজ জীবনী মার্শাল আর্ট মহাতারকা ব্রুস লি’র জীবনী

মার্শাল আর্ট মহাতারকা ব্রুস লি’র জীবনী

ব্রুস লি (১৯৪০-১৯৭৩)

ব্রুস লি ছিলেন হংকং থেকে হলিউডে উঠে আসা এমন এক অভিনেতা যিনি মার্শাল আর্টে নিজের দক্ষতা আর অভিনয় গুণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে উঠতে পেরেছিলেন চলচ্চিত্রের মহাতারকা। ক্ষণজন্মা এই অভিনেতা তার ছোট্ট ক্যারিয়ারে ‘ফিস্টস অব ফিউরি’ বা ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ এর মত হাতে গোনা কয়েকটি ছবি দিয়েই নিজেকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন সিনেমা প্রেমীদের মনে।

শৈশব

ব্রুস লি’র জন্ম ১৯৪০ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে। তার পারিবারিক নাম ছিল লি জুন ফ্যান। তার বাবা লি হই চুয়েন ছিলেন হংকংয়ের অপেরা গায়ক। ১৯৩৯ সালে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।

‘দ্য কিড’ (১৯৫০) ছবিতে শিশুশিল্পী ব্রুস লি

চল্লিশের দশকের প্রথমার্ধে লি হই চুয়েন ছোট্ট ব্রুস লি সহ পুরো পরিবারকে নিয়ে আবার ফিরে আসেন হংকংয়ে। অভিনয়ে সহজাত প্রতিভার অধিকারী ব্রুস লি ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে সেখানকার প্রায় ২০ টি ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। একপর্যায়ে নাচ শিখতে শুরু করেন লি। স্থানীয় চা-চা (কিউবার বিশেষ নাচ) প্রতিযোগিতায় একবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন তিনি। কবিতা লেখায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন লি।

১৬ বছর বয়সে ব্রুস লি কুংফু প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন বিখ্যাত মার্শাল আর্ট গুরু ইপ মানের তত্ত্বাবধানে। পথেঘাটে সমবয়সী কিশোর গ্যাংগুলোর সাথে ঘটা মারামারিতে বাড়তি সুবিধা পেতেই লি কুংফু শেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে মারামারির সেসব ঘটনা দিন দিন বাড়তে থাকায় ব্রুস লি’র উদ্বিগ্ন বাবা তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেইমত ১৯৫৯ সালে আবার মার্কিন মুলুকে পা রাখেন ব্রুস লি।

ওয়াশিংটনের এডিসনে ব্রুস লি তার স্কুলজীবন শেষ করেন। এরপর দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি স্থানীয় এক মার্শাল আর্ট স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় লিন্ডা এমেরির, যাকে ১৯৬৪ সালে বিয়ে করেন লি।

১৮ বছর বয়সে কিংবদন্তী মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক ইপ মানের সাথে ব্রুস লি

এরই মধ্যে নিজের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণে কেন্দ্র খুলে ফেলেন ব্রুস লি। কয়েকদিন পর স্ত্রী লিন্ডাকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান লি। সেখানে ওকল্যান্ড ও লস এঞ্জেলেসে আরও দু’টো মার্শাল আর্ট স্কুল খোলেন তিনি।

১৯৬৫ সালে ব্রুস লি ও লিন্ডা এমেরি দম্পতির প্রথম সন্তান ব্র্যান্ডনের জন্ম হয়। ১৯৬৯ সালে জন্ম নেয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান শ্যানন।

১৯৬৬ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ‘দ্য গ্রিন হরনেট’ নামের একটি টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করেন ব্রুস লি। এতে সিরিজটির মূল চরিত্র হরনেটের সঙ্গীর ভূমিকায় অভিনয় করে নিজের মার্শাল আর্ট দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পান লি। এর পরের দু’বছর আরও কিছু টিভি শো’য়ে অতিথি শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

১৯৬৯ সালে ব্রুস লি প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান ‘মার্লো’ ছবিতে। গোয়েন্দা গল্পের এই ছবিটিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন লি। আরও কয়েকটি ছবিতে এধরনের ছোটখাট ভূমিকায় অভিনয়ের পর ১৯৭১ সালে আবারও হংকংয়ে ফিরে আসেন তিনি।

হংকংয়ে ফিরে একসাথে দু’টি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন ব্রুস লি। এবার মুখ্য চরিত্রে, একেবারে নায়কের ভূমিকায়। প্রথম ছবি ‘দ্য বিগ বস’ (১৯৭১) মুক্তির পর পুরো এশিয়াজুড়ে দুর্দান্ত ব্যবসা করে। এই ছবির সুবাদে রাতারাতি তারকা হয়ে যান লি। পরের বছরই মুক্তি পায় দ্বিতীয় ছবি ‘ফিস্ট অব ফিউরি’ (১৯৭২)। এটি ভেঙে দেয় ‘দ্য বিগ বস’-র রেকর্ডও। ইন্ডাস্ট্রিতে শক্ত হয় ব্রুস লি’র অবস্থান।

‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ (১৯৭৩) ছবিতে ব্রুস লি

নায়ক হিসেবে নিজের প্রথম দু’টি ছবির অভাবনীয় সাফল্যের পর হংকংয়ের খ্যাতিমান প্রযোজক রেইমন্ড চাওয়ের সাথে মিলে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খোলেন লি। ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় ব্রুস লি’র আরও দু’টি সিনেমা ‘দ্য ওয়ে অব দ্য ড্রাগন’ ও ‘দ্য গেম অব ডেথ’।

১৯৭২ সালে ব্রুস লি’র ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে বিবেচিত ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ এর কাজ শুরু হয়। এটি ছিল হলিউড ও হংকংয়ের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম ছবি। ব্রুস লি ছাড়াও জন সাক্সোন, জিম কেলি, শি কেইনসহ দু’দেশের অভিনেতারা এতে অভিনয় করেন।

‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ মুক্তির নির্ধারিত তারিখের মাত্র এক সপ্তাহ আগে সকলকে স্থম্ভিত করে হঠাৎ মারা যান ব্রুস লি। মাত্র ৩২ বয়স হয়েছিল তার। এর একমাস পর নতুন তারিখে মুক্তি পায় ছবিটি। সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। একদিকে সদ্যপ্রয়াত ব্রুস লি’র প্রতি আবেগ, অন্যদিকে হলিউড, হংকংয়ের যৌথ প্রযোজনা, সাথে আকর্ষণীয় কাহিনী ও নির্মাণশৈলী, সব মিলিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে বিশ্বব্যাপী ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে ছবিটি।

মৃত্যু

১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে হংকংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্রুস লি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখা যায়, ব্যাথা কমাতে লি’র গ্রহণ করা ব্যাথানাশক ওষুধের প্রভাবেই মস্তিষ্ক বিকল হয়ে মারা যান তিনি।

ব্রুস লি’র স্ত্রী লিন্ডা স্বামীর মরদেহ নিয়ে ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ২৫ জুলাই সিয়াটলে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় লি’র। এরপর স্থানীয় লেক ভিউ সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যাকশন হিরো ব্রুস লি’কে।