Home জীবনী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিনের জীবনী

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিনের জীবনী

চার্লি চ্যাপলিন (১৮৮৯-১৯৭৭)

চার্লি চ্যাপলিনের জন্ম ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনে। তার বাবা-মা দু’জনেই কাজ করতেন স্থানীয় একটি মিউজিক হলে। মূলত এখান থেকে সংস্কৃতির প্রতি চ্যাপলিনের আকর্ষণের সূচনা।

১৯১০ সালে চার্লি চ্যাপলিন পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন সিনেমা শিল্পের কলেবর তখন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও প্রতিদিন অগণিত প্রতিভা ভিড় করছে হলিউডের আঙিনায়। চ্যাপলিনও ছিলেন সেই অগণিতের একজন। তবে প্রতিভার সেই ভিড়ে হারিয়ে যাননি তিনি। একটু একটু করে জায়গা করে নিতে শুরু করেন হলিউডে। একসময় সৃষ্টি করেন তার কালজয়ী কমেডি চরিত্র ‘ট্র্যাম্প’। ছোট গোঁফ, গোল টুপি আর ঢোলা প্যান্টের সেই অদ্ভুত চেহারা, আর তাতে চার্লি চ্যাপলিনের অ্নবদ্য অভিনয়ের গুণে অল্প সময়ের মধ্যেই সাড়া ফেলে দেয় চরিত্রটি। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের তারকায় পরিণত হন চ্যাপলিন। তার জনপ্রিয়তার ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করে আমেরিকার গন্ডি ছড়িয়ে দেশের বাইরেও।

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ (১৯৪০) ছবিতে হিটলারের ব্যাঙ্গাত্মক ভূমিকায়

সে সময়ে শুধু ট্র্যাম্পের চরিত্রেই একের পর এক সিনেমা করে গেছেন চার্লি চ্যাপলিন, অন্য কোন ভূমিকায় নয়। তবে অভিনয় ছাড়াও বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। চিত্রনাট্য লেখা, চরিত্র সৃষ্টি, প্রযোজনা ও পরিচালনা করা, আর সর্বোপরি মূল চরিত্রে অভিনয়, সব একহাতে করতেন চার্লি চ্যাপলিন। কাজের ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ খুঁতখুঁতে। শুটিংয়ের সময় নিজেতো কঠোর পরিশ্রম করতেনই, আশেপাশের সবাইকেও রীতিমত বাধ্য করতেন তাতে। নিজের প্রতিটি কাজের মান বাড়াতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন চ্যাপলিন। আর নির্মাতা হিসেবে সতর্ক থাকতেন কখনো যেন একঘেঁয়েমি চলে না আসে চিত্রনাট্যে।

কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য ছবি করেছেন চার্লি চ্যাপলিন। এগুলোর মধ্যে ‘সিটি লাইটস’ (১৯৩১), ‘মর্ডান টাইমস’ (১৯৩৬), ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ (১৯৪০) প্রভৃতি ছবিগুলোকে রাখা হয় সেরার তালিকায় ওপরের দিকে।

তার বহুল আলোচিত ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিটি ছিল জার্মান স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলার ও ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনিকে ব্যঙ্গ করে নির্মিত। তবে নিজে হিটলার ও তার নাৎসি জার্মানির কঠোর সমালোচক হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন না জানানোয় নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল চ্যাপলিনকে। সমাজতন্ত্রের প্রতি তার দূর্বলতাকেও এই হেনস্তার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়। এসবেরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র একসময় তার ভিসার মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানালে চ্যাপলিন বাধ্য হয়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান।

১৯৬৫ সালে স্ত্রী ওয়ানা ও’নিলের সাথে

১৯৫৬ সালে নিজ দেশ ব্রিটেনে সর্বোচ্চ সন্মান নাইটহুডের জন্য মনোনীত হন চ্যাপলিন। তবে মন্ত্রীসভার রক্ষণশীল কয়েকজন সদস্যের আপত্তিতে সেবার তাকে সে সন্মান জানাতে পারেনি ব্রিটিশ সরকার। তবে এর দু’দশক পর ১৯৭৫ সালে নিজেদের অতীত ভূল শুধরে চার্লি চ্যাপলিনকে নাইটহুড সন্মানে ভূষিত করে ব্রিটেন।

এর মধ্যেই ১৯৭২ সালে ‘লাইম লাইট’ ছবির আবহ সংগীতের জন্য অস্কার পুরষ্কার পান চার্লি চ্যাপলিন। একইসাথে চলচ্চিত্র শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য অস্কারের বিশেষ সন্মাননাও দেওয়া হয় তাকে। এই পুরষ্কার গ্রহণের জন্য দীর্ঘদিন পর আবারো যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখেন চ্যাপলিন। অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা টানা কয়েক মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে চার্লি চ্যাপলিনকে অভিবাদন জানান, অস্কার ইতিহাসে যেটি আজও অব্দি দীর্ঘতম ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ এর রেকর্ড হয়ে আছে।

আজীবন পর্দায় অগণিত মানুষকে হাসিয়ে যাওয়া চ্যাপলিন ব্যক্তিজীবনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন চারবার। শোনা যায়, এর বাইরেও তার সম্পর্ক ছিল আরও বহু নারীর সঙ্গে।

১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের সকালে সুইজারল্যান্ডের ভেভেতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন চার্লি চ্যাপলিন। বয়স হয়েছিল ৮৮। কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন চ্যাপলিন, একদিন যাদেরকেই তিনি হাসিয়ে গেছেন অকাতরে।