হোমপেজ জীবনী ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবনী

ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবনী

ডিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৬০-২০২০)

আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা দিয়েগো ম্যারাডোনা নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন। তিনি ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ এনে দেন আর্জেন্টিনাকে। ক্লাব পর্যায়ে ইতালি, স্পেন ও আর্জেন্টিনার বহু ক্লাবের শিরোপা জয়েরও নায়ক ছিলেন তিনি। ফুটবলে তার অসামান্য নৈপুণ্য আর দক্ষতা তাকে দিয়েছে কিংবদন্তীর মর্যাদা। আবার মাদকসহ নানা ইস্যুতে সমান বিতর্কিতও হয়েছে তার ঘটনাবহুল জীবন।

ম্যারাডোনার শৈশব

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স প্রদেশে। সেখানকারই ভিল্লা ফিয়োরিতো শহরে বেড়ে ওঠা তার। আট ভাইবোনের মধ্যে ম্যারাডোনা ছিলেন পঞ্চম। দারিদ্রের মধ্যে বড় হওয়া ম্যারাডোনা মাত্র ৩ বছর বয়সে কারও কাছ থেকে উপহার হিসেবে একটি ফুটবল পেয়েছিলেন। সেটিই তাকে খেলাটির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে তুলেছিল এবং পরবর্তীতে বদলে দিয়েছিল তার গোটা জীবন।

কিশোর ম্যারাডোনা ১৯৭৩ সালে

ক্লাব যাত্রা

ম্যারাডোনার বয়স যখন ১০ তখন তিনি আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় ক্লাব ‘আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স’ এর কিশোর শাখা ‘লোস সেবোলিটাস’-এ যোগ দেন। অসামান্য ফুটবল দক্ষতায় দ্রুতই পরিচিতি পেতে থাকেন তিনি। ১৯৭৬ সালে নিজের ১৬তম জন্মদিনের কয়েকদিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের মূল দলে জায়গা পেয়ে যান ম্যারাডোনা। পরের পাঁচ বছর ধরে ক্লাবটিতে খেলেন তিনি।

১৯৮১ সালে ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ম্যারাডোনাকে কিনে নেয় আর্জেন্টাইন ক্লাব ‘বোকা জুনিয়র্স’। আরও অনেক ক্লাব থেকে লোভনীয় প্রস্তাব পেলেও বোকা জুনিয়র্সেই ঘাঁটি গাড়েন ম্যারাডোনা। কারণ ছোটবেলা থেকে তিনি এই ক্লাবেই খেলার স্বপ্ন দেখে এসেছিলেন।

১৯৮২ বিশ্বকাপের পর বোকা জুনিয়র্স ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান ম্যারাডোনা/ তাকে পেতে রেকর্ড ৭.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে ক্লাবটি। তবে বার্সেলোনায় কাটানো ম্যারাডোনার দিনগুলো ছিল অসুস্থতা, ইনজুরি আর একের পর এক বিতর্কে জড়ানো। ১৯৮৪ সালে ইতালীয় ক্লাব ‘নাপোলি’-তে যোগ দেন ম্যারাডোনা। সেখানে কয়েক বছর কাটিয়ে ১৯৯২ সালে স্প্যানিশ ক্লাব ‘সারভিলা’ ও ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টাইন ক্লাব ‘নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ’ হয়ে ১৯৯৫ সালে আবারো বোকা জুনিয়র্সে ফেরেন ম্যারাডোনা।

বিশ্বকাপ অধ্যায়

দিয়েগো ম্যারাডোনার প্রথম বিশ্বকাপ মিশন ছিল ১৯৮২ সালে স্পেনে। তবে সেবার খুব একটা ছাপ ফেলতে পারেননি তিনি। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র ২ গোল করা ম্যারাডোনা নকআউট পর্বেও তুলতে পারেননি আর্জেন্টিনাকে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা নিজের সেই ঐতিহাসিক ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ এর কয়েক মূহুর্ত আগে

তবে পরের বিশ্বকাপেই নিজেকে সেরার উচ্চতায় নিয়ে যান ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ১৩তম আসরে ম্যারাডোনার অধিনায়কত্বে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।

পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা তাদের ৭টি ম্যাচের ৬টিই জিতে নেয়, একটি হয় ড্র। ম্যারাডোনার পা থেকে আসে ঐ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচ গোল।

এই ৮৬-র বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বহুল বিতর্কিত সেই ‘হাত দিয়ে করা’ গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটির প্রথম গোলটিতে বল ম্যারাডোনার হাতে লেগে গোলপোস্টে ঢুকেছিল। এ নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। ম্যারাডোনা বল হাতে লাগার কথা স্বীকার করলেও একে তার হাত নয় বরং ‘ঈশ্বরের হাত’ (হ্যান্ড অব গড) বলে মন্তব্য করেন।

আবার ঐ ম্যাচেরই দ্বিতীয় গোলটির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। নিজেদের ভাগে বল পেয়ে অর্ধেকের বেশি মাঠ পেরিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড় আর সবশেষে গোলকিপারকে পাশ কাটিয়ে যে গোলটি তিনি করেছিলেন, সেটি ২০০২ সালের ফিফা জরিপে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।

১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ম্যারাডোনা

এরপর সেমিফাইনালে বেলিজিয়ামকে ২-০ এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতার স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। ফিফার ‘গোল্ডেন বল’ আর কোটি মানুষের মনোযোগ জিতে নেন ম্যারাডোনা।

এরপর ইতালিতে ১৯৯০ ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে রানার্স আপ হয় আর্জেন্টিনা। তবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠতে ব্যর্থ হয় টিম ম্যারাডোনা।

বিতর্ক ও অবসর

দিয়েগো ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার তার ফুটবল নৈপুণ্যের জন্য যতটা আলোচিত ছিল, ঠিক ততটাই সমালোচিত হয়েছিল বিতর্কিত নানা কর্মকান্ডের জন্যও। ৮০-র দশকে ম্যারাডোনা কোকেনে আসক্ত হয়ে পড়েন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন তিনি। এর তিন বছর পর ১৯৯৪ বিশ্বকাপ চলাকালীন আরেক নিষিদ্ধ মাদক এফেড্রিন ধরা পড়ে ম্যারাডোনার শরীরে। আবারও নিষিদ্ধ করা হয় তাকে।

বয়স আর ইনজুরির জেরে ততদিনে ভাটা পড়তে শুরু করেছে ম্যারাডোনার ক্রীড়া নৈপুণ্যেও। একদিকে বিতর্ক অন্যদিকে নামতে থাকা খেলার মানের বাস্তবতায় ১৯৯৭ সালে অবসরের কথা ঘোষণা করেন দিয়েগো ম্যারাডোনা।

অবসরের পর

খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসরের পর দিয়েগো ম্যারাডোনা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্লাবে কোচ ও ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এদের মধ্যে আরব আমিরাতের ‘আল ওয়াসল এফসি’, ‘ফুজাইরাহ’, আর্জেন্টিনার ‘ডেপরোটিভো রিয়েস্টা’, ‘জিমনাসিয়া ডে লা প্লাটা’, মেক্সিকোর ‘ডোরাডোস’ ক্লাব অন্যতম।

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচের ভূমিকায় ২০০৯ সালে

এরই মধ্যে ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের তৎকালীন কোচ আলফিয়ো বাসিলে পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখান ম্যারাডোনা। আরও কয়েকজনের প্রার্থীতা যাচাই বাছাই শেষে সেবছরের অক্টোবরে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাতেই জাতীয় দলের নতুন কোচের দায়িত্ব তুলে দেয় আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন।

আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার কোচিংয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নেয় ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়। গ্রুপ পর্বে নাইজেরিয়াকে ১-০, দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-১ এবং গ্রিসকে ২-০ গোলে হারায় ম্যারাডোনার দল। এই পর্বে অপরাজিত আর্জেন্টিনা নকআউট পর্বে মেক্সিকোকেও হারায় ৩-১ গোলে। একের পর এক দাপুটে জয়ে আর্জেন্টিনার মনোবল যখন তুঙ্গে, তখনই ঘটে বিপর্যয়। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে আর্জেন্টিনা। পঞ্চম স্থান নিয়ে দেশে ফেরেন ম্যারাডোনা ও তার টিম। এর পরের মাসেই জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ম্যারাডোনার মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।

পারিবারিক জীবন

ম্যারাডোনা ১৯৮৪ সালে বুয়েন্স আয়ার্সে দীর্ঘদিনের বান্ধবী ক্লডিয়া ভিল্লাফনেকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে। বিয়ের দু’দশকের মাথায় ২০০৪ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ করেন ম্যারাডোনা ও ক্লডিয়া। তবে তারা নিজেদের মধ্যে এখনও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এই জুটিকে প্রায়ই স্টেডিয়ামে একসাথে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করতে দেখা যায়। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলো গ্যালারিতে একসাথে বসে দেখেন ম্যারাডোনা ও ক্লডিয়া।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইতালির নাপোলস শহরের এক নারী দাবি করেন ম্যারাডোনা তার সন্তান দিয়েগো সিনাগরার বাবা। ম্যারাডোনা সে দাবি নাকচ করলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শিশুটির প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানার জন্য ডিএনএ টেস্টের সুযোগ থাকলেও ম্যারাডোনা তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এর প্রেক্ষিতে আদালত ১৯৯৩ সালে দিয়েগো সিনাগরাকে ম্যারাডোনারই সন্তান বলে রায় দেয়। বহু বছর অস্বীকারের পর ২০১৬ সালে ম্যারাডোনা আনুষ্ঠানিকভাবে সিনাগরাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পরবর্তী বিভিন্ন সময়েও ম্যারাডোনার বিবাহ বহির্ভূত একাধিক সম্পর্ক থেকে আরও অন্তত পাঁচ সন্তানের তথ্য সামনে আসে।