হোমপেজ ইতিহাস কিভাবে ঘটেছিল বার্লিন প্রাচীরের পতন?

কিভাবে ঘটেছিল বার্লিন প্রাচীরের পতন?

বার্লিন প্রাচীরের ওপরে উঠে এর পতনের ঐতিহাসিক মূহুর্তগুলো উৎযাপন করছে জনতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, ইতালি ও জাপানের জোট ‘অক্ষশক্তির’ বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জোট ‘মিত্রশক্তির’। যুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় ঘটলে জার্মানিকে দখলে নিয়ে নেয় মিত্রশক্তি। তবে সেখানে নতুন শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের সাথে মতবিরোধ তৈরি হয় গণতান্ত্রিক ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয় জার্মানিকে ভেঙে দু’টো দেশ করা হবে। পূর্ব জার্মানি হবে সমাজতান্ত্রিক আর পশ্চিম জার্মানি গণতান্ত্রিক।

নতুন সীমানা ব্যবস্থায় অবিভক্ত জার্মানির রাজধানী বার্লিনের স্থান হয় সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানির ভেতরে। সেটিকেও একই সমীকরণে ভেঙে দুই অংশে ভাগ করা হয়। সেইমত যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম বার্লিন ভৌগোলিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ড দ্বারা।

বার্লিন অবরোধ

সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে আদর্শগত উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের মে মাসে পশ্চিম জার্মানিকে ‘শিক্ষা’ দিতে পূর্ব জার্মানি নিজেদের ভূখন্ডে এতদিন ভৌগোলিকভাবে অবরুদ্ধ থাকা পশ্চিম বার্লিনের ওপর অর্থনৈতিকভাবেও অবরোধ আরোপ করে। পশ্চিম বার্লিনের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দেয় সেখানে।

সোভিয়েত সমর্থিত পূর্ব জার্মানির ধারণা ছিল, অবরোধের কারণে সৃষ্ট খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর সংকটের জেরে পশ্চিম বার্লিন ত্যাগ করবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। কিন্তু দেশ তিনটির অভিনব এক পদক্ষেপে তাদের সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। স্থল সীমান্তে পারাপার বন্ধ হলেও বিমান চলাচল ছিল উন্মুক্ত। সেইমত পশ্চিম জার্মানির নাগরিকদের জন্য বিমানে করে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেওয়া শুরু করে ঐ তিন দেশ।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের এই অভাবনীয় পদক্ষেপ ‘বার্লিন এয়ারলিফট’ নামে পরিচিতি পায় এবং এটি চলে দীর্ঘ এক বছর ধরে। এই সময়ের মধ্যে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ মিলিয়ে মোট ২.৩ মিলিয়ন টন সামগ্রী বিমানে করে পশ্চিম জার্মানিতে সরবরাহ করা হয়।

প্রাচীর নির্মাণের পর বিভিন্ন স্থানে এটির সামনে স্থাপন করা হয় ট্যাংক প্রতিরোধী প্রতিবন্ধকতাও
নির্মাণের পর ওপর থেকে দেখা বার্লিন প্রাচীরের একাংশ

বছরব্যাপী চলার পর অবশেষে ১৯৪৯ সালের জুনে পশ্চিম বার্লিনের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

এর পরের এক দশক পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সম্পর্ক ছিল তুলনামূলক শান্ত। তবে ১৯৫৮ সাল থেকে নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় দুই দেশ। মুক্ত অর্থনীতির সুবাদে পশ্চিম জার্মানি শুরু থেকেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ফলে সেখানকার নাগরিকদের আর্থিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার মান ছিল পূর্ব জার্মানির বাসিন্দাদের থেকে বহুগুণ উন্নত।

এছাড়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় মতপ্রকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা কিংবা প্রতিভা ও দক্ষতা উন্মেষের যে সুযোগ পশ্চিমের নাগরিকরা পেতেন, পূর্ব জার্মানিতে তা কল্পনাও করা যেতনা। এসব কারণে পূর্বের মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের সীমানা পাড়ি দিয়ে পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে।

দু’দেশের মূল সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় পূর্ব থেকে পশ্চিম জার্মানিতে সরাসরি ঢুকে পড়া অতটা সহজ ছিলনা। তাই তারা পূর্ব জার্মান ভূখন্ডের ভেতরে থাকা পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম বার্লিনে চলে যেতে শুরু করেন। উল্লেখ্য, বার্লিনে আগে থেকেই দুই অংশের মানুষ কেনাকাটা, জীবিকা নির্বাহ কিংবা সিনেমা-থিয়েটার দেখার জন্য এপার থেকে ওপারে যাতায়াত করতে পারতেন। এমনকি তাদের যাতায়াতের জন্য ট্রেন পরিষেবাও চালু ছিল ঐ অঞ্চলে।

কিন্তু ১৯৫৮ সাল থেকে পূর্ব বার্লিনের মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে গণহারে পশ্চিমে চলে যাওয়া শুরু করেন। দিন দিন এর মাত্রা বাড়তে থাকে। ১৯৬১ সালের জুনে ১৯,০০০ লোক পূর্ব থেকে পশ্চিম বার্লিনে ঢোকে, জুলাই মাসে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩০,০০০। আগস্টের শুধু প্রথম এগারো দিনেই ১৬,০০০ মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় আর ১২ আগস্ট যায় ২,৪০০ জন, যা একদিনে বার্লিনের সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সর্বোচ্চ রেকর্ড।

পূর্ব জার্মানির হাজার হাজার নাগরিকের এভাবে দেশত্যাগ করে পশ্চিমে চলে যাওয়া ঠেকাতে তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ পূর্ব জার্মান সরকারকে দুই বার্লিনের সীমান্ত পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দিতে বলেন। সেইমত কাজে নেমে পড়ে পূর্ব জার্মানির সেনাবাহিনী, পুলিশ ও নির্মাণ শ্রমিকরা। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমান্ত বরাবর কংক্রিটের দেয়াল তৈরি করে ফেলে তারা। সাথে কাঁটাতারের বেড়া। এই দেয়ালই পরিচিত পায় ‘বার্লিন প্রাচীর’ নামে।

বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের ফলে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। তবে প্রাচীরের তিনটি পয়েন্টে গেট বা চেকপোস্ট তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি চেকপয়েন্ট এতে যোগ করা হয়। কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা আর বিশেষ অনুমতি পাওয়া ভ্রমণকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে এসব চেকপয়েন্ট দিয়ে এপার থেকে ওপারে যাতায়াত করতে পারতেন।

তবে পূর্ব দিকের বাসিন্দাদের পশ্চিম বার্লিনে চলে যাওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি এই প্রাচীর। ১৯৬১ সালে নির্মাণের পর থেকে ১৯৮৯ সালে ভেঙে ফেলা পর্যন্ত ৬০০ সীমান্তরক্ষীসহ পূর্ব জার্মানির ৫,০০০ নাগরিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে পালিয়ে যান।

এদের কেউ দেয়ালটি টপকে, কেউ দেয়ালের কিছু জায়গায় নির্মিত জানালা পেরিয়ে, কেউ বিশাল গ্যাস বেলুনের সাহায্য নিয়ে, কেউ দেয়ালের নিচের দিকে থাকা সুয়ারেজের নালা বেয়ে আবার কেউ দেয়ালের অরক্ষিত অংশে জোরে গাড়ি চালিয়ে সীমানা পার হয়ে চলে যান।

তবে সকলের ভাগ্য এদের মত সুপ্রসন্নও ছিলনা। এই পুরো সময়ে সব মিলিয়ে ১৭১ জন অন্যপারে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিসহ বিভিন্নভাবে প্রাণ হারান। ধরা পড়ে কারাদন্ডসহ বিভিন্ন শাস্তির মুখোমুখি হন আরও বহু মানুষ।

বার্লিনের প্রাচীরের পতনের ঘোষণার পর এটি ভাঙার কাজে হাত লাগায় উল্লসিত জনতাও
প্রাচীর ভাঙার কাজে ব্যবহার করা হয় বুলডোজারও

বার্লিন প্রাচীরের পতন

আশির দশকের শেষ নাগাদ গণআন্দোলনের মুখে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারাবিশ্বেই সমাজতান্ত্রিক শাসনের ভিত দূর্বল হতে শুরু থাকে। এর আঁচ এসে পড়ে পূর্ব জার্মানিতেও। সেখানকার সরকারের বিরুদ্ধেও পথে নামে বিক্ষুব্ধ পূর্ব জার্মানরা।

নিজেদের পতন আসন্ন জেনে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর পূর্ব বার্লিনের কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করে বার্লিন প্রাচীর উন্মুক্ত করে দেওয়ার। তারা জানায়, এখন থেকে পূর্বের মানুষ বিনা বাধায় সীমান্ত পাড়ি দিতে পারবে।

এই ঘোষণার সাথে সাথে বার্লিনের পূর্ব ও পশ্চিম, উভয় অংশের মানুষ বার্লিন প্রাচীরে এসে সমবেত হয়। তারা প্রাচীরের ওপর উঠে নেচে-গেয়ে, বিয়ার আর শ্যাম্পেইনে মুখ ডুবিয়ে মুক্তির স্বাদ উদযাপন করতে শুরু করে আর সমবেত কন্ঠে জার্মান ভাষায় স্লোগান দিতে থাকে “তর অউফ” (ফটক খুলে দাও)। তারা স্প্রে পেইন্ট আর রং-তুলি দিয়ে দেয়ালের গায়ে ছবি এঁকে, স্লোগান লিখে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে।

স্মারক হিসেবে রেখে দেওয়া বার্লিন প্রাচীরের কিছু অংশ

মধ্যরাতে বার্লিন প্রাচীরের গেটগুলো খুলে দেওয়া হলে হাজার হাজার মানুষ সীমানার ওপারে ছুটে যায়। দু’পারের মানুষ হাতুড়ি, গাইতি, শাবল দিয়ে বার্লিন প্রাচীর ভাঙতে শুরু করে। পরের দিনগুলোতে সরকারিভাবেই বুলডোজার আর ক্রেন দিয়ে প্রাচীর ভাঙা চলতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যেই স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়া কিছু অংশ বাদে বার্লিন প্রাচীরের বাকি পুরোটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বার্লিন প্রাচীরের পতনের এক বছরের মাথায় ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আবার একীভূত হয়ে একক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।