Home ইতিহাস প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির পেছনের কাহিনী

প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির পেছনের কাহিনী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতেই মিত্রশক্তির কাছে খবর পৌঁছে যায়, ইউরেনিয়াম কণা ভাঙার প্রক্রিয়া প্রায় রপ্ত করে ফেলেছে জার্মান বিজ্ঞানীরা। আলবার্ট আইনস্টাইন এবং এনরিকো ফারমি তখন নাৎসী জার্মানি আর ফ্যাসিস্ত ইতালি সরকারের হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। আসন্ন মহাবিপদ নিয়ে সতর্ক হয়ে পড়েন দুজনেই। ভয়ংকর পারমানবিক বোমা তৈরির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে জার্মানি! আর উন্মত্ত হিটলার যে এই মারণাস্ত্র যেকোন সময় যেকারো ওপর প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবেননা তাতে কোন সন্দেহ নেই। যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

আইনস্টাইল আর ফারমি সিদ্ধান্ত নেন আসন্ন মহাবিপদ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে অবহিত করবেন এবং তাকে অনুরোধ করবেন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব পরমাণু গবেষণা কর্মসূচী জোরদার করতে। আইনস্টাইন চিঠি লিখলেন রুজভেল্টকে আর ফারমি ওয়াশিংটনে গিয়ে দেখা করলেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সাথে। কিন্তু ঘটনার গভীরতা বোঝানো গেলনা কাউকেই। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট শুধু মার্কিন পরমাণু কর্মসূচীর গতি বাড়াতে সম্মত হলেন মাত্র।

কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন গোয়েন্দারাও প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে জানাতে লাগলেন পরমাণু বোমা তৈরিতে জার্মান তৎপরতার কথা। টনক নড়ে মার্কিন প্রশাসনের। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নির্দেশ দেন পরমাণু গবেষণা পুরোদমে জোরদার করতে। মূল উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব পরমাণু বোমা তৈরি করা। পুরো প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘দ্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।

১৯৪২ সালের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল কলম্বিয়া, শিকাগো আর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেবছর ডিসেম্বরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মত নিয়ন্ত্রিত পরমাণু চেইন রিয়েকশনের পর এক ধাক্কায় পাল্টে যায় চিত্র। সরকারী অনুদানে উপচে পড়তে থাকে পরমাণু গবেষণার তহবিল। একের পর এক নতুন পরমাণু স্থাপনা তৈরি হতে থাকে হ্যানফোর্ড, টেন্নেসি, ওক ব্রিজ, লস আলমাসে। ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ হয়, কর্মসংস্থান হয় ১২০০০০ লোকের।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পারমানবিক বোমা তৈরির তৎপরতা অক্ষশক্তির কাছে গোপন রাখতে এর বিস্তারিত যুক্তরাষ্ট্রের হাতেগোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তার মাঝেই সীমিত রাখা হয়। বাকিদের বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে এই পরমাণু গবেষণা। এমনকি ভাইস-প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান নিজে পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত এবিষয়ে জানতেননা কিছুই।

কয়েক বছরের গবেষণার পর অবশেষে পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাইকে এর প্রথম পরীক্ষার দিন হিসেবে ধার্য করা হয়। সেদিন বিজ্ঞানী, গবেষক আর সামরিক-বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়ো হন নিউ মেক্সিকোর আলমোগোর্ডোতে। সবার উপস্থিতিতে ১০০ ফুট উঁচু একটি টাওয়ার থেকে নিচে ফেলা হয় পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্টপারমানবিক বোমাটি।

বোমাটি মাটিতে আছড়ে পড়ার সাথে সাথে প্রচন্ড আলোর ঝলকানিতে ভরে যায় পুরো এলাকা। ২০০ মাইল দূর থেকেও সেই আলো দেখা যায়। প্রকান্ড মাশরুমের মত ধোঁয়ার কুন্ডলী ওপরে উঠে যায় প্রায় ৪০,০০০ ফুট পর্যন্ত। ১০০ মাইল ব্যাসার্ধের ভেতরে থাকা সব ভবনের কাঁচ ভেঙে পড়ে।

এই পরীক্ষার কথাও গোপন রাখা হয়েছিল সাধারণ মানুষের কাছে। বিস্ফোরণের ব্যাখ্যায় গণমাধ্যমে বলা হয়, গোলাবারুদ বোঝাই একটি সামরিক কনভয়ে দূর্ঘটনার কারণে ঘটেছে এই প্রকান্ড বিস্ফোরণ। ততদিনে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হ্যারি এস ট্রুম্যানকে ঘটনাস্থল থেকে জানানো হয় বিস্তারিত। ভয়ংকর এক মারণাস্ত্রের অসুস্থ প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো বিশ্ব।