Home জীবনী অবিস্মরণীয় সংগীত প্রতিভা জন লেননের জীবনী

অবিস্মরণীয় সংগীত প্রতিভা জন লেননের জীবনী

জন লেনন (১৯৪০-১৯৮০)

জন লেননের যখন জন্ম হয়, অক্সফোর্ড ম্যাটারনিটি হাসপাতাল তখন একটু পরপর কেঁপে উঠছিল নাৎসি বিমানবাহিনীর ক্রমাগত বোমা হামলায়। জার্মান বিমান আক্রমণের মধ্যেই সেদিন জন্ম হয়েছিল সংগীত ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকার।

দিনটি ছিল ১৯৪০ সালের ৯ অক্টোবর। শৈশবে নৌবাহিনীতে কর্মরত পিতাকে খুব কমই কাছে পেয়েছিলেন লেনন। মায়ের বোন মিমি স্মিথের কাছেই বেড়ে ওঠা তার।

বিটলসের দুই প্রাণপুরুষ, পল ম্যাককার্টনি ও জন লেনন

স্কুলজীবনে তার গানের মতই দুরন্ত ছিলেন জন লেনন। শিক্ষক আর সহপাঠীদের কন্ঠ, আচরণ সব হুবহু নকল করতে পারতেন। ফলে খুব দ্রুতই পুরো স্কুলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন লেনন। কিশোর বয়সেই নিজের প্রথম গিটার হাতে পান লেনন। পড়াশোনায় সময় কমে যায় তার। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তখন থেকে তার কাটত নিজের রুমে গান বেঁধে আর গান গেয়ে।

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে জন লেনন কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তার প্রথম ব্যান্ড ‘দ্য কুয়ারিম্যান’। এটিকেই পরবর্তীকালের কিংবদন্তী বিটলস ব্যান্ডের ভিত্তি বলা যেতে পারে। ১৯৫৭ সালে লেননের পরিচয় হয় পল ম্যাককার্টনির সাথে। দুজনের বন্ধুত্ব খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের পরিণত করে সফল এক সংগীত জুটিতে। এর ক’দিন পরেই তারা প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিটলস’ ব্যান্ড।

ম্যাককার্টনির চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় আর সংগীতে দখল কিছুটা বেশি থাকার সুবাদে লেননই তাদের গানের দলের প্রধানের ভুমিকা পালন করতেন। পরে অবশ্য ম্যাককার্টনির পরামর্শেই জর্জ হ্যারিসনকে সেই জায়গায় বসান লেনন।

একফ্রেমে বিটলসের চার সদস্য

১৯৬১ সালের ২১ মার্চ বিটলস তাদের প্রথম লাইভ কনসার্ট করার সুযোগ পায়। লিভারপুলের ‘দ্য ক্যারাভান ক্লাবে’-এ আয়োজিত এই কনসার্টে অবশ্য খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বিটলস। সংগীত সমালোচকদের সমালোচনা হজম করতে হয় তাদের।

১৯৬২ সালে পার্লোফোনের সাথে চুক্তি করে বিটলস। ধীরে ধীরে পায়ের নিচে জমি পেতে শুরু করে ব্যান্ডটি। ৬০-র দশকের গোড়া থেকেই একটু একটু করে জনপ্রিয়তা পেতে আরম্ভ করে বিটলস। সেসময় লেননই ব্যান্ডের ভোকাল হিসেবে শোগুলোতে পারফর্ম করতেন, তবে ব্যান্ডের সব সিদ্ধান্তই নেয়া হত সর্বসম্মতভাবে।

এদিকে ব্যান্ডের সাথে সাথে গায়ক হিসেবে যতটা জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলেন লেনন, একের পর এক বিতর্কেও ঠিক ততটাই জড়িয়ে পড়তে থাকেন তিনি। একবার লেনন মন্তব্য করে বসেন, বিটলসের জনপ্রিয়তা যীশুখ্রীষ্টের চেয়েও বেশি! পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় নিন্দার ঝড় বয়ে যায় তার এই মন্তব্যে। পরিস্থিতি সামাল দিতে লেলন বলেন, তিনি কোন সম্প্রদায়কে আঘাত করার জন্য এমনটি বলেননি, কেবল বিটলসের জনপ্রিয়তার পরিধি বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও মানুষের ক্ষোভ শান্ত করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু অঙ্গরাজ্যে লেনন ও তার ব্যান্ড বিটলসকে নিষিদ্ধ করা হয়। প্রায় প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বিটলসের অ্যালবামের রেকর্ড পোড়ানোর ঘটনা ঘটতে থাকে। অবশ্য এসব নিয়েও জন লেলন মজা করতে ছাড়েননি, ‘অন্তত পোড়ানোর জন্য হলেও তারা আমার অ্যালবাম কিনছে!’

স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সাথে

১৯৬৯ সাল নাগাদ বিটলস সদস্যদের মধ্যকার দ্বন্দ ক্রমেই বাড়তে থাকে। জন লেননের নিজের একক ক্যারিয়ার গড়ার আকাঙ্খাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হত। ১৯৭০ এর পরে লেনন তার স্বপ্নপূরণ করেন, আত্মপ্রকাশ করেন একক শিল্পী হিসেবে, সফলতাও পান। লেননের এই উত্তরণে তার দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়োকো ওনোর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরপর থেকে একের পর এক হিট গান উপহার দিতে থাকেন জন লেনন। এর মধ্যে তার ‘ইম্যাজিন’ গানটি এক জরিপে সেসময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসেবে নির্বাচিত হয়।

৭০-র দশকের শুরুতে জন লেনন ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তার গাওয়া ‘গিভ পিস আ চান্স’ সেসময়কার যুদ্ধবিরোধী কর্মসূচিগুলোর প্রধান সংগীত হয়ে ওঠে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ক্ষুব্ধ করে মার্কিন সরকারকে। নিক্সন প্রশাসন নানাভাবে তাকে হেনস্তা করতে শুরু করে, এমনকি তাকে ব্রিটেনে ফেরৎ পাঠানোরও উদ্যোগ নেয়। এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামেন লেনন এবং সরকারের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীনকার্ড লাভ করেন।

জন লেননের উত্তাল, বর্ণময় জীবনের শেষটাও ছিল তেমনই। ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান লেনন। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব। বন্ধু থেকে শত্রু, সহযাত্রী থেকে প্রতিদ্বন্দী, শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন সকলে। পৃথিবী হারায় এক অবিষ্মরণীয় সংগীত প্রতিভাকে।