Home বিজ্ঞান জুন আলমেইদা, করোনা ভাইরাস আবিষ্কার করেছিলেন যে নারী

জুন আলমেইদা, করোনা ভাইরাস আবিষ্কার করেছিলেন যে নারী

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী তান্ডব চালানোর আগ পর্যন্ত নভেল করোনা ভাইরাসের নাম পৃথিবীর খুব কম মানুষই জানতেন। অনেকের ধারণা এটি একেবারেই নতুন খুঁজে পাওয়া একটি ভাইরাস। আসলে তা নয়। ভাইরাসটি আবিষ্কৃত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে।

করোনা ভাইরাস যিনি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেওয়া এক নারী। নাম জুন আলমেইদা। তার বাবা ছিলেন স্কটল্যান্ডের এক সাধারণ বাস চালক।

১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নিজের ল্যাবরটরিতে জুন আলমেইদা যে ভাইরাসটি আবিষ্কৃত করেছিলেন, তারই একটি প্রকার আজকের প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। আর এই ভাইরাসের আক্রমণে সৃষ্ট রোগের বৈজ্ঞানিক নাম কোভিড-১৯।

জুন আলমেইদা (১৯৩০-২০০৭)

জুন আলমেইদার জন্ম ১৯৩০ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে। সেখানেই এক ভাড়াবাড়িতে বেড়ে ওঠা জুন খুব বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিতে হয় জুনকে।

এরপর গ্লাসগোর একটি হাসপাতালে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকরি নেন জুন। পরবর্তীতে কাজের সূত্রে তিনি চলে আসেন লন্ডনে। সেখানে ১৯৫৪ সালে বিয়ে করেন ভেনেজুয়েলার শিল্পী এনরিকাস আলমেইদাকে।

কিছুদিন পর স্বামী ও একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে কানাডার টরেন্টোতে পাড়ি দেন জুন আলমেইদা। সেখানে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারে দারুণ পারদর্শিতা অর্জন করেন জুন।

টরেন্টোতে থাকাকালীন অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে ভাইরাসের গুচ্ছকে একস্থানে জড়ো করে সেগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে দেখার কৌশল আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জুন আলমেইদা। এদিকে এরই মধ্যে জুনের মেধা ও দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পেরে তাকে আবারও ফিরে আসার জন্য আহবান জানায় তার পুরনো কর্মস্থল সেন্ট থমাস হাসপাতাল। তাতে সাড়া দিয়ে ১৯৬৪ সালে লন্ডনে ফিরে আসেন জুন।

সেন্ট থমাস হাসপাতা্লের মেডিকেল স্কুলে ড. ডেভিড টায়রেলের সাথে গবেষণার কাজ শুরু করেন জুন আলমেইদা। ড. টায়রেল সেসময় সাধারণ ঠান্ডাজনিত জ্বর-সর্দি বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন। তাতে এমন কিছু ভাইরাস নিয়ে তিনি কাজ করছিলেন যেগুলোর কয়েকটিকে কৃত্রিমভাবে পরিমানে বৃদ্ধি করা যাচ্ছিল, কিন্তু কয়েকটির বেলায় তা সম্ভব হচ্ছিলনা। ড. টায়রেল সেগুলোকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার জন্য কিছু নমুনা জুন আলমেইদার কাছে পাঠান।

জুন আলমেইদা সেগুলোকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে জানালেন, নমুনায় পাঠানো ভাইরাসগুলোর একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতই কিন্তু পুরোপরি তা নয়। তিনিই প্রথমবারের মত সম্পূর্ণ নতুন এই ভাইরাসটিকে চিহ্নিত করলেন, যার পরিবর্তিত রূপই হল আজকের প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাস।

উল্লেখ্য, ঐদিনের আগেও জুন আলমেইদা ভাইরাসটিকে দেখেছিলেন ইঁদুরের হেপাটাইটিস ও মুরগীর ব্রংকাইটিস সংক্রমণ নিয়ে তার নিজের করা গবেষণার সময়। সেই গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ ও ভাইরাসটির ছবি তিনি একটি বিজ্ঞান জার্নালে পাঠিয়েওছিলেন। কিন্তু তারা ‘ভাইরাসটি আসলে ইনফ্লুয়েঞ্জার এবং ছবিটি আবছা হওয়ায় এটিকে নতুন কোন ভাইরাস বলে মনে হচ্ছে’ মন্তব্য করে তার সে গবেষণাকে নাকচ করে দেন।

সেন্ট থমাস হাসপাতালের মেডিকেল স্কুলে চালানো গবেষণায় আবিষ্কৃত ভাইরাসের কথা ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশ করা হয়। তার দু’বছর পর আরেক জার্নালে প্রকাশিত হয় ভাইরাসটির ছবি।

আবিষ্কারের পর ড. ডেভিড টায়রেল, জুন আলমেইদা ও সেন্ট থমাস হাসপাতালের মেডিকেল স্কুলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা অধ্যাপক টনি ওয়াটারসন নতুন ভাইরাসটির নাম দেন ‘করোনা ভাইরাস’ । ল্যাটিন ভাষা থেকে আগত ‘করোনা’ শব্দের অর্থ মুকুট। ভাইরাসটির ছবিতে এর চারিদিকে মুকুটের মত একটি বৃত্ত দেখা যাওয়ায় ভাইরাসটির এই নাম দিয়েছিলেন তারা।

জুন আলমেইদা পরবর্তী সময়ে লন্ডনের পোস্টগ্রাজুয়েট মেডিকেল স্কুলে যোগদান করেন। সেখানে তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। তিনি তার কর্মজীবন শেষ করেন ওয়েলকাম ইনস্টিটিউটে। অবসরের পর কিছুদিন যোগাসনের শিক্ষক হিসেবে সময় কাটালেও ৮০’র দশকে আবারও ভাইরাসের জগতে উপদেষ্টা হিসেবে ফিরে আসতে হয় জুনকে। কারণ সেসময় বিশ্ব দাপাচ্ছে আরেক মরণব্যাধি এইডস। এই রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস এইচআইভি-র ছবি তৈরিতে সেসময় ভূমিকা রেখেছিলেন জুন।

২০০৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন জুন আলমেইদা, যাকে আজ মানুষ আবার স্মরণ করছে তার আবিষ্কৃত ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে।