Home ইতিহাস চাঁদের মাটিতে পা রাখার অবিস্মরণীয় সেই দিনটি

চাঁদের মাটিতে পা রাখার অবিস্মরণীয় সেই দিনটি

নীল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিন্স এবং এডুইন অলড্রিন

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই তারিখটি মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনটিতে মহাবিশ্বের এক গ্রহের কোন প্রাণী প্রথমবার পা রেখেছিল আরেক গ্রহের মাটিতে। বহু শতকের স্বপ্ন, বহু দশকের পরিকল্পনা, বহু বছরের চেষ্টার পর অবশেষে এসেছিল এই সাফল্য। এর এক দশক আগেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি মার্কিন কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন চাঁদের মাটিতে মানুষ পাঠানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা।

১৯৬৮ সালের অক্টোবরে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা মনুষ্যবাহী অ্যাপোলো-৭ মহাকাশযানকে পৃথিবীর চারদিক প্রদক্ষিণ করিয়ে আনে। একই বছর ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-৮ মহাকাশযানে চড়ে তিনজন নভোচারী চাঁদের অন্ধকার অংশ ঘুরে আসে। ১৯৬৯ সালে মার্চ মাসে চাঁদের মাটিতে অবতরণের জন্য নির্মিত ‘ঈগল’ নামের মডিউলটিকে অ্যাপোলো-৯ এর মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো হয় পরীক্ষার জন্য। একই বছর মে মাসে অ্যাপোলো-১০ মহাকাশযানে তিন নভোচারী চাঁদের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে আসে জুলাইয়ের চূড়ান্ত অভিযানের শেষ প্রস্তুতি হিসেবে।

চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদচারণা

অ্যাপোলো-১১

১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৯ টা ৩১ মিনিটে তিন মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন আর মাইকেল কলিন্সকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নভোযান অ্যাপোলো-১১ শুরু করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রা। ২৪০০০০ মাইল আর ৭৬ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রার পর অ্যাপোলো-১১ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে ১৯ জুলাই। পরের দিন নীল আর্মস্ট্রং আর এডুইন অলড্রিনকে নিয়ে ‘ঈগল’ মডিউলটি অ্যাপোলো-১১ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চাঁদের দিকে নামতে শুরু করে। অ্যাপোলো-১১ থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মাইকেল কলিন্স। বিকেল ৪ টা ১৭ মিনিটে চাঁদের মাটি স্পর্শ করে মডিউল ‘ঈগল’। নীল আর্মস্ট্রং যুক্তরাষ্ট্রের হাউসটনের কমান্ড সেন্টারে বার্তা পাঠান, “ঈগল অবতরণ করেছে।”

এরপর কয়েকঘন্টার অপেক্ষা। রাত ১০ টা ৩৯ মিনিটে ‘ঈগল’-র দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন নীল আর্মস্ট্রং। মডিউলটির সাথে সংযুক্ত ক্যামেরার সাহায্যে সেই দৃশ্য তখন রুদ্ধশ্বাসে টেলিভিশনের পর্দায় দেখছেন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। রাত ১০ টা ৫৬ মিনিটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে চাঁদের মাটিতে পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং। সৃষ্টি হয় মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম মূহুর্তের। আর্মস্ট্রং বলে ওঠেন তার সেই বিখ্যাত উক্তি, “এটি একজন মানুষের জন্য ছোট্ট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল…।”

“এটি একজন মানুষের জন্য ছোট্ট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল…”

১৯ মিনিট পর এডউইন অলড্রিনও বেরিয়ে এসে পা রাখেন চাঁদের মাটিতে। দু’জনে মিলে একের পর এক ছবি তুলে নেন চাঁদের, সংগ্রহ করে নেন মাটি, ধূলা, পাথরসহ চাঁদের বিভিন্ন নমুনা। চাঁদের বুকে তারা গেঁথে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি পতাকা আর একটি ধাতব প্লেট, যাতে লেখা ছিল, “এখানে পৃথিবী থেকে মানুষ এসে প্রথম চাঁদে পা রেখেছিল। জুলাই ১৯৬৯ খ্রীষ্টাব্দ। আমরা এসেছিলাম সমগ্র মানবজাতির শান্তির জন্য।” এর মধ্যে আর্মস্ট্রং আর অলড্রিনের সাথে ফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।

কয়েক ঘন্টা চাঁদের বুকে অবস্থানের পর ঈগলে ফিরে আসেন আর্মস্ট্রং আর অলড্রিন। রাতটি সেখানেই কাটিয়ে ২১ জুলাই দুপুর ১ টা ৫৪ মিনিটে চাঁদের মাটি ছাড়ে ঈগল। ৫ টা ৩৫ মিনিটে অ্যাপোলো-১১ মহাকাশযানের সাথে যুক্ত হয় মডিউলটি। ২২ জুলাই রাত ১২ টা ৫৬ মিনিটে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে অ্যাপোলো-১১। স্বপ্নের এক সফর শেষে ২৪ জুলাই দুপুর ১২ টা ৫০ নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগরে নামে নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন আর মাইকেল কলিন্সকে বহনকারী অ্যাপোলো-১১।