Home জীবনী দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনী

দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনী

নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩)

দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দেশটির ট্রান্সকেইতে। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় টেমবু আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় প্রবল আগ্রহী ম্যান্ডেলা উচ্চশিক্ষা শেষ করেন ইউনিভার্সিটি অব ফোর্ট হেয়ার ও ইউনিভার্সিটি অব উইটওয়াটারস্র্যান্ড থেকে। ১৯৪২ সালে আইন বিভাগে ডিগ্রি অর্জন করেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর তখনকার বর্ণবাদী সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ ম্যান্ডেলাকে প্রবলভাবে নাড়া দিতে শুরু করে। এসবের বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচী আর সেমিনারগুলোতে নিয়মিত অংশ নিতে শুরু করেন তরুণ ম্যান্ডেলা। ১৯৪৩ সালে ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (এএনসি)-তে যোগদানের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতির মঞ্চ থেকে জাতীয় রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে তার।

রাজনৈতিক জীবন শুরুর দিনগুলোতে

এএনসি-র কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেলসন ম্যান্ডেলার মত উচ্চশিক্ষিত নেতা খুব বেশি ছিলেননা। ফলে দ্রুতই দলটির শীর্ষস্তরে পৌঁছে যান তিনি। এছাড়া আইনজীবি হিসেবে সরকারের হাতে নির্যাতিত কর্মীদের আইনী সহায়তা দেবার সুবাদে দলে ম্যান্ডেলার প্রভাবও বাড়তে থাকে দিনকে দিন।

১৯৫৬ সালে বর্ণবাদী শেতাঙ্গ সরকারের বিরোধিতা করার দায়ে কয়েকজন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয় নেলসন ম্যান্ডেলাকে, অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের। ৫ বছর কারাগারে আটকে রেখেও অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় রাষ্ট্রপক্ষ। ১৯৬১-তে মুক্তি পান ম্যান্ডেলা।

ততদিনে এএনসি-কে নিষিদ্ধ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার। দলের অভ্যন্তরে ম্যান্ডেলা প্রস্তাব করেন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের। সেইমত গঠন করা হয় এএনসি-র সামরিক শাখা ‘উমখোনতো উই সিজওয়ে’ (জাতির বর্শা)। এটির কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয় গেরিলা কায়দায় সরকারি বাহিনীর মোকাবেলা করা। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে এসে একের পর এক রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা চালিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে ওঠে এএনসি-র এই সামরিক শাখা।

১৯৬৩ সালে আবারো গ্রেফতার করা হয় নেলসন ম্যান্ডেলাকে। আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ‘অবৈধ পন্থায় সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টার’ গুরুতর অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। মামলাটি সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বর্ণবাদ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আলোচনার এজেন্ডা হয়ে ওঠে। মূলত এই মামলাটির মাধ্যমেই নেলসন ম্যান্ডেলা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেন। সমর্থকদের আশঙ্কাকে সত্যি করে আলোচিত এই মামলায় নেলসন ম্যান্ডেলাকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার আদালত, অবশ্য যা পরে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে নামিয়ে আনা হয়। রায় ঘোষণার সময় দেয়া এক দীর্ঘ ভাষণে ম্যান্ডেলা বলে, “দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা বাস করেন দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সবার, কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়।” ম্যান্ডেলা গণতন্ত্রের প্রতিও তার পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেন।

অ্যাপার্থাইড সরকারের শেষ প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ক্লার্কের সাথে

যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত নেলসন ম্যান্ডেলাকে রাখা হয় কেপ টাউনের কুখ্যাত রোবেন আইল্যান্ডের কারাগারে। এর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ছিল এককথায় জঘন্য। কিন্তু ধৈর্য্যশীল ম্যান্ডেলা নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করেন এর সাথে। বই পড়ে, শরীরচর্চা করে নিয়মানুবর্তী এক জীবনাচরণ গড়ে তোলের তিনি। এটি আকর্ষণ করতে শুরু করে অন্যান্য বন্দীদেরও। ম্যান্ডেলার সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, রাজনৈতিক দর্শন আর সকলের সাথে সুসম্পর্কের জেরে কারাগারে তার প্রভাব এতটাই বাড়তে থাকে যে কয়েকজন শেতাঙ্গ কারারক্ষীর সাথেও তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

এদিকে কারাগারের বাইরে নেলসন ম্যান্ডেলা ততদিনে পরিণত হয়ে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা হিসেবে, একইসাথে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখও। দেশের বাইরে থেকেও তার মুক্তির দাবি উঠতে শুরু করে। একের পর এক দেশ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর। প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এএনসি এবং এর নেতা ম্যান্ডেলার সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় সরকার। নিজের আদর্শে অবিচল থেকে সরকারের দেওয়া শর্তাধীন মুক্তির একাধিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

নোবেল শান্তি পুরষ্কার গ্রহণ করছেন নেলসন ম্যান্ডেলা

অবশেষে মাথা নত করতে বাধ্য হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার। তিন দশকের কারাভোগ শেষে ১৯৯০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয় নেলসন ম্যান্ডেলাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশে ঘটে নতুন সূর্যোদয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিসরে একের পর এক সংস্কার সাধিত হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মত ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় বসে ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’। নেলসন ম্যান্ডেলা শপথ নেন ক’দিন আগেও শেতাঙ্গ শাসিত দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

দায়িত্ব পেয়েই ক্ষমা ও ঔদার্য্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন নেলসন ম্যান্ডেলা। যাদের জন্য জীবনের ত্রিশটি বছর কারাগারের অন্ধকারে কেটেছে তার, তাদের সবাইকেই ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করে দেন ম্যান্ডেলা। তবে একইসাথে বর্ণবাদী সরকারের নিপীড়নের চিত্রগুলো খুঁজে বের করতে আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে কমিশনও গঠন করা হয়। আর ম্যান্ডেলা শুরু করেন সাদা-কালো সবাইকে নিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযাত্রায়।

তবে খুব বেশিদিন এই যাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাননি ম্যান্ডেলা। ৫ বছর সফলভাবে দেশ পরিচালনার পর স্বাস্থ্যগত কারণে সরে দাড়ান নেলসন ম্যান্ডেলা। উত্তরসুরী থাবো এমবেকির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ১৯৯৯ সালে রাজনীতি থেকেও অবসর নেন তিনি। পরবর্তী বছরগুলোতে জনসমক্ষে আসাও কমিয়ে দেন ম্যান্ডেলা। তবে এইডস বিরোধী কর্মসূচি কিংবা ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদে সরব হতে দেখা যেত তাকে।

নেলসন ম্যান্ডেলা জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছেন পরিবারের একান্ত সান্নিধ্যে। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনবার। ৬ সন্তান আর ১৭ নাতি-নাতনির সফল অভিভাবক ম্যান্ডেলা দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর চিরনিদ্রায় যাত্রা করেন। পৃথিবী হারায় তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।