হোমপেজ জীবনী জনতার রাজকুমারী প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনী

জনতার রাজকুমারী প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনী

প্রিন্সেস ডায়ানা (১৯৬১-১৯৯৭) (Image: Reuters)

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রের নাম প্রিন্সেস ডায়ানা। রাণী এলিজাবেথের জেষ্ঠ্য সন্তান প্রিন্স চার্লসের সাথে বিবাহ সূত্রে ব্রিটিশ রাজপরিবারে প্রবেশ ডায়ানার। তবে নিজের স্বাধীন সত্ত্বার জেরে একসময় চার্লস ও রাজপরিবারের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় তার। বিবাহ বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে নিজের নতুন জীবন শুরু করেন ডায়ানা। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্যারিসে ভয়াবহ এক সড়ক দূর্ঘটনায় নিভে যায় ‘পিপলস প্রিন্সেস’ এর জীবন প্রদীপ।

প্রথম জীবন

ডায়ানা ফ্রান্সেস স্পেনসারের জন্ম ১৯৬১ সালের ১ জুলাই ইংল্যান্ডের সানড্রিংহামে। ডায়ানা যখন ছোট তখন তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বাবার কাছেই বড় হন ডায়ানা ও তার দুই বোন ও এক ভাই।

প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানার ঐতিহাসিক সেই বিয়ে (Image: Reuters)

ডায়ানার শিক্ষাজীবন শুরু হয় রিডেলসওয়র্থ হল স্কুল ও পরবর্তীতে ওয়েস্ট হিথ স্কুলে। লাজুক স্বভাবের ডায়ানা পড়াশোনার পাশাপাশি নাচতে ও গান গাইতে ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন শিশুদের। তাই স্কুলজীবন শেষ করে লন্ডনের একটি কিন্ডারগার্ডেনে সহকারি হিসেবে যোগ দেন তিনি।

প্রিন্স চার্লসের সাথে প্রেম

ব্রিটিশ যুবরাজ ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ চার্লসের সাথে ডায়ানা স্পেনসারের প্রেমের শুরু ১৯৭৭ সালে। চার্লস ছিলেন তার চেয়ে ১৩ বছরের বড়। অবশ্য তারা একে অপরকে ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। শৈশবে ডায়ানা ছিলেন চার্লসের দুই ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ডের খেলার সাথী।

১৯৮১ সালের ৬ ফ্রেব্রুয়ারি চৌদ্দটি হীরা বসানো সোনার আংটি দিয়ে ডায়ানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন প্রিন্স চার্লস। সম্মতি জানান ডায়ানা। রাজপরিবারে শুরু হয় স্মরণকালের সবচেয়ে আলোচিত বিয়ের প্রস্তুতি।

ঐতিহাসিক সেই বিয়ে

১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানা স্পেনসার। ২৬৫০ জন আমন্ত্রিত অতিথি যোগ দেন বিয়ের মূল আয়োজনে। চার্লস ও ডায়ানা আলাদাভাবে ক্যাথিড্রালে পৌঁছান। আর বিয়ের পর একই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে রাজপ্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

বিয়েতে ডায়ানার পরনে ছিল ১০,০০০ মুক্তা বসানো সিল্কের সাদা গাউন। মাথায় ছিল স্পেনসার পরিবারের অষ্টাদশ শতাব্দীর মুকুট। তার ওপরে ২৫ ফুট লম্বা এক ঘোমটা। বিয়ের পর ডায়ানা স্পেনসারের আনুষ্ঠানিক নাম হয় প্রিন্সেস ডায়ানা। আর উপাধি ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’।

চার্লস ও ডায়ানার বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনের মাধ্যমে উপভোগ করেন বিশ্বের প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ। গণমাধ্যম বিয়েটির নামকরণ করে ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিয়ে’।

দুই সন্তান উইলিয়াম ও হ্যারির সাথে প্রিন্সেস ডায়ানা ও প্রিন্স চার্লস (Image: Reuters)

উইলিয়াম ও হ্যারি

বিয়ের পরের বছর ১৯৮২ সালের ২১ জুন জন্ম নেয় প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানার প্রথম সন্তান। নাম রাখা হয় প্রিন্স উইলিয়াম আর্থার ফিলিপ লুইস। এর দু’বছর পর ১৯৮৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভূমিষ্ঠ হয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান প্রিন্স হ্যারি চার্লস অ্যালবার্ট ডেভিড।

বিবাহ বিচ্ছেদ

বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই দূরত্ব তৈরি হতে থাকে ডায়ানা ও চার্লসের মধ্যে। স্বাধীনচেতা ডায়ানা মানিয়ে নিতে পারছিলেননা রাজপরিবারের ধরাবাঁধা নিয়মনীতির সাথেও। ১৯৯২ সালে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর রাজপরিবারের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানার বিচ্ছেদের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। ১৯৯৬ সালে চার্লস ও ডায়ানার বিবাহ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

স্থলমাইন বিরোধী প্রচারণায় সামনের সারিতে ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা (Image: Reuters)

সামাজিক কর্মকান্ড

প্রিন্স চার্লসের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর ডায়ানা দুই ছেলেকে বড় করা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হন তিনি। এইডস আক্রান্ত শিশু ও গৃহহীনদের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেন ডায়ানা। এছাড়া আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ অ্যাঙ্গোলায় পরিত্যক্ত মাইনের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি। এসব কাজে অংশ নিতে এশিয়া থেকে আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, পৃথিবীর সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন ডায়ানা, মিশেছেন অতিসাধারণ দরিদ্র মানুষদের সাথেও। যার কারণে একসময় ‘পিপলস প্রিন্সেস’ (জনগণের রাজকুমারী) উপাধিতে ভূষিত হন ডায়ানা।

দোদি ফায়েদের সাথে সম্পর্ক

প্রিন্স চার্লসের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর ডায়ানা সম্পর্কে জড়ান মিশরীয় সিনেমা প্রযোজক দোদি আল ফায়েদের সাথে। ধনকুবের দোদি ফায়েদের সাথে ডায়ানার পরিচয় হয়েছিল ১৯৮৬ সালে একটি পোলো ম্যাচে। সেখানে প্রিন্স চার্লস ও দোদি ফায়েদ ছিলেন একে অন্যের বিপক্ষ দলে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর দোদি ফায়েদের বিলাসবহুল ভ্রমণতরীতে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে সময় কাটাতে দেখা যেত ডায়ানাকে। জানা যায়, দোদি ফায়েদের সাথে ডায়ানার সম্পর্ককে সুনজরে দেখতেননা রাণী এলিজাবেথসহ রাজপরিবারের সদস্যরা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারেরও এ সম্পর্কের ব্যাপারে অসন্তোষ ছিল।

জীবদ্দশায় সবসময়ই গণমাধ্যমের ক্যামেরার ফোকাসে থাকতেন ডায়ানা (Image: Reuters)

মৃত্যু

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসের রাস্তায় ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হয় প্রিন্সেস ডায়ানা ও দোদি আল ফায়েদের গাড়ি। তাদের পিছু নেওয়া ফটো সাংবাদিকদের এড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে গাড়িটি। দোদি ফায়েদ ও গাড়িচালক ঘটনাস্থলেই মারা যান। মূমুর্ষ ডায়ানাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু আঘাত গুরুতর হওয়ায় বাঁচানো যায়নি তাকে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন ‘পিপলস প্রিন্সেস’ ডায়ানা।

ডায়ানার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব। দেশ-বিদেশ থেকে ডায়ানার ভক্ত, অনুরাগীরা শোক জানাতে শুরু করেন। প্রথমে প্রতিক্রিয়া না জানালেও সমালোচনার মুখে রাণী এলিজাবেথ বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে টেলিভিশনে প্রচারিত শোকবার্তায় প্রাক্তন পুত্রবধুকে স্মরণ করেন।

শেষযাত্রা ও সমাধি

৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় প্রিন্সেস ডায়ানার শেষকৃত্য। কেনসিংটন প্রাসাদ থেকে ডায়ানার শবদেহ ছয়টি কালো ঘোড়ায় টানা কামানবাহী শকটে করে ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় পথের দু’ধারে হাজার হাজার মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে শেষবারের মত বিদায় জানান প্রিন্সেস ডায়ানাকে। দীর্ঘ চার মাইলের এই যাত্রার শেষের দিকে পায়ে হেঁটে যোগ দেয় ডায়ানার দুই সন্তান ১৫ বছরের প্রিন্স উইলিয়াম ও ১২ বছরের প্রিন্স হ্যারি।

ডায়ানার শেষকৃত্যে তার কফিনের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে প্রিন্স চার্লস, উইলিয়াম ও হ্যারি (Image: Reuters)

ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে রাণী এলিজাবেথসহ রাজপরিবারের সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ ব্রিটিশ মন্ত্রীসভা এবং দেশি-বিদেশি অতিথিরা অংশ নেন। আর টেলিভিশনের পর্দায় অনুষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ করেন সারা বিশ্বের প্রায় আড়াইশো কোটি মানুষ। অনুষ্ঠানে ডায়ানাকে স্মরণ করে বক্তব্য রাখেন তার সহোদর চার্লস স্পেনসার। ‘গুডবাই ইংল্যান্ডজ রোজ’ শিরোনামে আবেগঘন একটি গান পরিবেশন করেন শিল্পী এলটন জন।

প্রিন্সেস ডায়ানাকে সমাহিত করা হয় স্পেনসারদের পারিবারিক এস্টেট আলথর্পের একটি পুকুরের মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপে।