Home ইতিহাস ফিরে দেখা টাইটানিক, ইতিহাসের আলোচিততম সেই জাহাজ

ফিরে দেখা টাইটানিক, ইতিহাসের আলোচিততম সেই জাহাজ

যাত্রার আগ মূহুর্তে সাউদাম্পটন বন্দরে 'আরএমএস টাইটানিক', এর কয়েক ঘন্টা পরেই ইতিহাসের করূণতম নৌ-দূর্ঘটনার শিকার হয় জাহাজটি

১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল রাত ২টায় কানাডার দক্ষিণ উপকূল থেকে ৪০০ মাইল দূরে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে গিয়েছিল ইতিহাসের আলোচিততম জাহাজ ‘আরএমএস টাইটানিক’। প্রায় ২২০০ যাত্রী ও ক্রু বহনকারী জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আড়াই ঘন্টা আগে প্রকান্ড এক বরফখন্ডের সাথে ধাক্কা খেয়েছিল।

১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দর থেকে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে আরএমএস টাইটানিক। এটি ছিল সে সময়কার বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিলাসবহুল বেসামরিক জাহাজ। আইরিশ জাহাজনির্মাতা উইলিয়াম পিরের নকশায় জাহাজটি তৈরি করা হয় বেলফাস্টে।

ফিরে দেখা টাইটানিক, ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত জাহাজ
পাশ থেকে এমনটাই দেখতে ছিল ‘আরএমএস টাইটানিক’

৮৮৩ ফুট লম্বা জাহাজটিতে ছিল ১৬টি কম্পার্টমেন্ট, প্রত্যেকটিই জলনিরোধক। মূলত এই বৈশিষ্ট্যটির জন্যই টাইটানিক সম্পর্কে জনশ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, “টাইটানিক কখনো ডুববেনা।”

অনেকেই জানেননা, বন্দর ছাড়ার ঠিক আগ মূহুর্তে ছোটখাট একটা দূর্ঘটনার মুখে পড়েছিল টাইটানিক। ‘নিউইয়র্ক’ নামের একটি স্টিমারের সাথে প্রায় ধাক্কা লেগে গিয়েছিল টাইটানিকের, কিন্তু শেষ মূহুর্তে রক্ষা পায়। অনেকের মতে, সেদিন সেই ছোট্ট দুর্ঘটনাটি যদি ঘটত, তাহলে টাইটানিকের যাত্রা বিলম্বিত হত। আর তাতে পাঁচদিন পর ঘটা ইতিহাসের করুণতম নৌ-দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়ে যেত জাহাজটি।

১০ এপ্রিলের যাত্রা ছিল নির্মাণের পর আরএমএস টাইটানিকের প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, মাত্র পাঁচদিনের মাথায় ২৪৩৫ জন যাত্রী আর ৮৯২ জন ক্রু নিয়ে আটলান্টিকে ডুবে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে এটি পরিণত হয় জাহাজটির শেষ যাত্রাতেও।

সাউদাম্পটন ছাড়ার পর ফ্রান্সের চেরবুর্গ আর আয়ারল্যান্ডের কুইন্সটাউন থেকে শেষ কয়েকজন যাত্রী তুলে নেয় টাইটানিক। এরপরই সর্বোচ্চ গতি তুলে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হয় জাহাজটি।

এই বরফখন্ডটির ধাক্কাতেই টাইটানিক ডুবে যায় বলে ধারণা। ছবিটি দুর্ঘটনার কয়েকঘন্টা পর ১৫ এপ্রিল সকালে তোলা

১৪ এপ্রিল রাতে টাইটানিকের ক্যাপ্টেন ও অন্যান্য অফিসাররা খবর পান সামনে থেকে প্রকান্ড এক বরফখন্ড এগিয়ে আসার। সংঘর্ষ এড়াতে সর্বশক্তি দিয়ে তারা জাহাজটির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। বরফখন্ডটির সাথে ধাক্কা লাগে টাইটানিকের নিচের অংশের। যে ১৬টি কম্পার্টমেন্ট নিয়ে গর্বের শেষ ছিলনা এর নির্মাতাদের, তাদের প্রায় ৫টি ফেটে যায় বরফখন্ডের ধাক্কায়। একটু একটু করে জল ঢুকতে শুরু করে কম্পার্টমেন্টগুলোয়। একটা থেকে আরেকটায়, সেটা থেকে পরেরটায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে ডুবতে শুরু করে টাইটানিক। কয়েক মিনিট পরে ভেসে থাকা অংশের ভারে মাঝ বরাবর ভেঙে যায় জাহাজটি। রাত ২ টা ২০ মিনিট নাগাদ সাগরে পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়ে যায় সুবিশাল আরএমএস টাইটানিক।

কিছুটা টাইটানিক জাহাজটি নিয়ে এর নির্মাতাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর কিছুটা এর নকশায় পর্যাপ্ত জায়গা না রাখার কারণে, জাহাজটিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফবোট ছিলনা। এটাকে সেদিনের ঘটনায় এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০০ মানুষ মারা যায় টাইটানিক ডুবে যাওয়ার ঘটনায়। যে ৭০০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছিল তাদের বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু।

টাইটানিক সাগরে তলিয়ে যাওয়ার দেড় ঘন্টা পর ‘কারপাথিয়া’ নামের একটি জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। লাইফবোট থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করে জাহাজটি। কয়েকজনকে জল থেকেও উদ্ধার করা হয় যারা লাইফজ্যাকেটের সাহায্যে ভেসে ছিল।

১৯৮৫ সালে আটলান্টিকের ১৩,০০০ ফুট গভীরে খুঁজে পাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত টাইটানিকের সামনের অংশ

পরবর্তী সময়ে তদন্তে জানা যায়, টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সময় ‘ক্যালিফোর্নিয়ান’ নামের একটি জাহাজ মাত্র ২০ মাইল দূর দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু জাহাজটির রেডিও অপারেটর সেসময় দায়িত্বে না থাকায় টাইটানিক থেকে আসা সাহায্যের আবেদনের বার্তা শুনতে পাননি।

টাইটানিক দুর্ঘটনার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে আটলান্টিকের দু’পাড়েই। ভবিষ্যৎে এধরনের দূর্ঘটনা এড়াতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে সরকারগুলো। ১৯১৩ সালে নৌযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজন করা হয় এক কনভেনশনের। সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে সব নৌযানে, সকল যাত্রী ও ক্রুদের বহন করার মত প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফবোট রাখতে হবে। নিয়মিত ভিত্তিতে নৌ মহড়া করা বাধ্যতামূলক করা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল আইস প্যাট্রল’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয় উত্তর আটলান্টিকের নৌ রুটে ভেসে থাকা বরফখন্ডগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য। প্রত্যেক জাহাজে ২৪ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে বলা হয়।

দূর্ঘটনার কয়েক দশক পরে ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের একটি যৌথ অনুসন্ধানী দল সমুদ্রপৃষ্ঠের ১৩,০০০ ফুট নিচে টাইটানিকের ধ্বংশাবশেষ খুঁজে পায়।