Home জীবনী অ্যাপল এর প্রতিষ্ঠাতা প্রযুক্তি বিষ্ময় স্টিভ জবসের জীবনী

অ্যাপল এর প্রতিষ্ঠাতা প্রযুক্তি বিষ্ময় স্টিভ জবসের জীবনী

স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১)

স্টিভ জবসের জন্ম ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে। স্টিভের জন্মের সময় তার সিরিয়ান অভিবাসী বাবা জন জান্দালি ও মা জোয়ান স্কিবেল সিম্পসন ছিলেন অবিবাহিত। তাই সমাজের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জন ও জোয়ানতাদের নবজাতক সন্তানকে স্বীকৃতি দিতে চাননি। তারা স্টিভকে দান করে দেন এক অনাথ আশ্রমে। সেখান থেকে তাকে দত্তক নেন পল জবস ও ক্লারা জবস দম্পতি। বড় হয়ে নিজের আসল বাবা-মায়ের পরিচয় জানলেও পল আর ক্লারাকেই আজীবন নিজের আসল পিতা-মাতার মর্যাদা দিয়ে গেছেন স্টিভ।

ইলেকট্রনিকসের প্রতি স্টিভ জবসের আকর্ষণের শুরু তার বাবা পল জবসের হাত ধরে। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে তিনি স্টিভকে উৎসাহ দিতেন। এটাই তাকে পরবর্তী জীবনে নতুন নতুন প্রযুক্তির সন্ধান ও আবিষ্কারে প্রভাবিত করেছিল।

স্টিভ জবসের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় একটি স্কুলে। সেখান থেকে পাশ করে তিনি ভর্তি হন রিড কলেজে। অসাধারণ ফলাফল আর জানার অদম্য আগ্রহের কারণে তিনি খুব দ্রুত সেখানে আলাদা জায়গা করে দেন। কখনো কখনো এমনকি কলেজের অধ্যপকেরাও স্টিভের কৌতুহলের কাছে হার মানতেন।

রিড কলেজে পড়ার সময়ই স্টিভ ক্যালিগ্রাফির একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, অ্যাপল ডিভাইসগুলোতে নানা রকমের ইন্টারফেস এবং স্পেস ফন্টের ধারণা তিনি ঐ ক্যালিগ্রাফি কোর্সটি থেকে পেয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবনের শেষে ৭০-এর দশকের গোড়ায়, তিনি ‘আটারি কম্পিউটার্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেই ১৯৭১ সালে তার পরিচয় হয় স্টিভ ওজনাইকের সাথে। প্রযুক্তিতে তুখোড় জ্ঞান ও কৌতুহল তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে দেয়। স্টিভ ওজনিয়াক ও আরেক প্রযুক্তিবিদ রোনাল্ড ওয়ানকে সাথে নিয়ে ১৯৭৬ সালে স্টিভ জবস প্রতিষ্ঠা করেন আজকের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপল কম্পিউটার্স’। মজার তথ্য হল, অ্যাপল কম্পিউটার্সের প্রথম শোরুম ছিল জবস পরিবারে গাড়ির গ্যারেজ!

তারুণ্যে অ্যাপেল প্রধান

কয়েক বছরের মধ্যেই অ্যাপল কম্পিউটার্সের সাফল্য তাদের নিজেদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। একদিকে বিশ্বজুড়ে হোম কম্পিউটারের তুমুল চাহিদা, অন্যদিকে অ্যাপল কম্পিউটারের গুণগত উচ্চমানের জন্য এটি দ্রুতই ক্রেতাদের কাঙ্খিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। এরই মধ্যে ১৯৮৪ সালে স্টিভ জবস আরেক মাইলফলক স্থাপন করেন, প্রথম ম্যাকিন্টোশ কম্পিউটার উদ্ভাবন করে। এটিই ছিল গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস সংবলিত প্রথম কম্পিউটার। এটির ধারণাই পরবর্তীতে সকল আধুনিক কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেটের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

এদিকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাফল্যের সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দও দানা বাঁধতে থাকে অ্যাপল কম্পিউটার্সের অন্দরমহলে। বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্যের জেরে ১৯৮৫ সালে স্টিভ জবসের কিছু দাপ্তরিক দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে অ্যাপল থেকে পদত্যাগ করেন স্টিভ। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে স্টিভ বলেছিলেন, অ্যাপল কম্পিউটার্স থেকে চলে আসাটা বরং তাকে আরও বেশি স্বাধীন হতে ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করেছিল।

অ্যাপল ছাড়ার ক’দিনের মধ্যেই স্টিভ জবস প্রতিষ্ঠা করেন ‘নেক্সট কম্পিউটার্স’ নামের আরেক প্রযুক্তি সংস্থা। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি এমনকি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতেও ব্যর্থ হয়। স্টিভের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও এটির পতন ঠেকানো যাচ্ছিলনা। শেষমেশ ১৯৯৬ সালে ৪২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ‘নেক্সট কম্পিউটার্স’ বিক্রি করে দেন স্টিভ।

এসবের মধ্যেই স্টিভ জবস হাত দেন আরেক প্রকল্পে। গোড়াপত্তন করেন ‘পিক্সার আমেরিকান স্টুডিও’ নামের কম্পিউটার গ্রাফিক্সভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ সংস্থার। ডিজনির সাথে মিলে ‘টয় স্টোরি’, ‘আ বাগস লাইফ’, ‘ফাইন্ডিং নিমো’-র মত একের পর এক হিট সিনেমা পিক্সারকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া পরিচিতি। নিজের হারানো গৌরব আবারো ফিরে পেতে শুরু করেন স্টিভ জবস।

এদিকে পুরনো সঙ্গীদের সাথে মিটমাটের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে আবারো অ্যাপেল কম্পিউটার্সে ফেরেন স্টিভ জবস। অ্যাপল তখন পার করছে কঠিন এক সময়। বাজারে এসে গেছে মাইক্রোসফটের মত জোরালো প্রতিদ্বন্দী। পুরনো সামাজ্য ফিরে পেতে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর পদে বসানো হয় স্টিভকে। দায়িত্ব নিয়েই একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন তিনি। বন্ধ করে দেন বেশকিছু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, চালু করেন নতুন কয়েকটি। গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেন অ্যাপল ডিভাইসগুলোর যথাসম্ভব ক্ষুদ্রাকৃতি ও সহজে বহনযোগ্যতার ওপর। আইপড ছিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গান শোনার পোর্টেবল ডিভাইসের ইতিহাসে বিপ্লব নিয়ে এসেছিল যন্ত্রটি। ২০০৮ সালের পর্যন্ত ২০০ মিলিয়ন আইপড বিক্রি হয়েছিল আর তাতে ৬ বিলিয়ন গান ডাউনলোড করা হয়েছিল।

আইপডের পর স্মার্টফোনের জগৎেও পা রাখেন স্টিভ জবস। ২০০৭ সালে তিনি বাজারে আনেন আইফোন। এর দারুণ দারুণ সব ফিচারস আর আকর্ষণীয় অপারেটিং সিস্টেমের বদৌলতে দ্রুতই এটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা চাহিদাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যে পরিণত হয়।

এভাবেই একের পর এক সফল পদক্ষেপে অ্যাপল কম্পিউটার্সকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় আবারও স্বমহিমায় অধিষ্ঠীত করতে সক্ষম হন স্টিভ জবস। মাইক্রোসফটসহ প্রতিদ্বন্দীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে অ্যাপল। ব্যবসায়িক সাফল্যের সাথে সাথে কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন স্টিভ জবস। শুধু অ্যাপল কম্পিউটার্সের প্রধান নির্বাহী হিসেবেই তার সম্পদের পরিমান ছিল ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর অ্যাপল ও ডিজনির শেয়ার মিলিয়ে যে অঙ্কটা প্রায় ৮.৩ বিলিয়িন।

ব্যক্তিজীবনে তিন সন্তানের জনক ছিলেন স্টিভ জবস। তার স্ত্রী লরেন্স পাওয়েল একজন শিক্ষা অধিকার ও অভিবাসন সংস্কার কর্মী। ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি বিস্ময় স্টিভ জবস।