হোমপেজ ইতিহাস তিয়েনানমান স্কোয়ারের গণবিক্ষোভের মর্মান্তিক পরিণতি

তিয়েনানমান স্কোয়ারের গণবিক্ষোভের মর্মান্তিক পরিণতি

তিয়েনানমান স্কোয়ারে সমবেত হয়ে সংস্কারের দাবিতে সেদিন বিক্ষোভ শুরু করেছিল হাজার হাজার মানুষ (Image: Reuters)

গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষভাগে গণবিক্ষোভের মুখে সারাবিশ্বেই সমাজতান্ত্রিক শাসনের ভিত দূর্বল হয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমে আসে বিক্ষুব্ধ জনগণ। ১৯৪৯ সাল থেকে কমিউনিস্ট শাসনে থাকা চীনও ছিল তাদের অন্যতম।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের দাবিতে চীনের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনে নামে দেশটির ছাত্রসমাজ। বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী বেইজিংয়ের প্রধান চত্বর তিয়েনানমান স্কোয়ার। মধ্য এপ্রিল থেকে সেখানে জমায়েত হতে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। একসময় তাতে যোগ দেয় অন্যান্য শ্রেণী-পেশার মানুষও।

আধুনিক চীনের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঐ গণজাগরণের সূত্রপাত হয় ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুতে। কমিউনিস্ট নেতা হওয়া স্বত্তেও বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় চীনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনেক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হু। যার কারণে সংস্কারপন্থী সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।

আবার একই কারণে তাকে অপছন্দ করতেন কমিউনিস্ট পার্টির কট্টর নেতারা। তারা ও সামরিক অফিসারদের একাংশ একজোট হয়ে ১৯৮৭ সালে হু ইয়াওবাংকে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়েতে বাধ্য করেন। এরপর থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আর সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি তাকে।

১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান হু ইয়াওবাং। জনগণের চাপের মুখে তার শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করতে বাধ্য হয় কমিউনিস্ট পার্টি। এতে যোগ দেন পার্টির শীর্ষনেতারা। কয়েকদিন পর সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের জন্য ২২ এপ্রিল আরেকটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তিয়েনানমান স্কোয়ার সংলগ্ন ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ মিলনায়তনে।

হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুর পর থেকেই তিয়েনানমান স্কোয়ার এলাকায় ছোট ছোট আকারে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ২২ এপ্রিল হু’র শেষকৃত্যের দিনে সংখ্যাটি ছাড়িয়ে যায় ৫০ হাজার। ক্রমেই হু ইয়াওবাংয়ের প্রতি তাদের শোক পরিণত হতে থাকে সরকারের প্রতি ক্ষোভে। একদলীয় শাসনে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি, বাক-স্বাধীনতার অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের এতদিনকার হতাশার বিস্ফোরণ ঘটে তিয়েনানমান স্কোয়ারে। এসবের সুরাহার দাবিতে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়ে চীনের ছাত্রসমাজ। ধীরে ধীরে তাতে যোগ দিতে থাকে অন্যান্য পেশা ও পরিচয়ের মানুষও।

বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হয়ে গনগণ দাবি জানাতে থাকে গণতান্ত্রিক অধিকারের (Image: Reuters)

অপ্রত্যাশিত এই গণঅবস্থানের ঘটনায় চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। দলের নেতাদের কেউ কেউ আন্দোলনের দাবিগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও বাকিরা একে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এর মধ্যে ১৫ মে বেইজিং সফর করেন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভ। তাকে স্বাগত জানাতে তিয়েনানমান স্কোয়ারে যে অনুষ্ঠান পূর্বনির্ধারিত ছিল, ছাত্র-জনতার অবস্থানের কারণে স্থান পরিবর্তন করে তা বিমানবন্দরেই সম্পন্ন করতে হয়। এতে আরেক দফা বিব্রত হয় চীনা সরকার। এছাড়া রাজধানীর আন্দোলন দেশের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন শহরে তিয়েনানমান স্কোয়ারের আদলে অবস্থান নিতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ।

পরিস্থিতি দিনকে দিন হাতের বাইরে চলে যেতে থাকায় কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কমিউনিস্ট পার্টি। ২০ মে সামরিক আইন জারি করা হয় এবং প্রায় ২৫০,০০০ সেনাকে বেইজিংয়ে জড়ো করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধের মুখে বেইজিংয়ের আশেপাশের ঘাঁটি থেকে রওনা হওয়া সেনারা রাজধানীতে ঢুকতেই ব্যর্থ হয়। এর প্রেক্ষিতে ২৪ মে সেনাদের আবার ঘাঁটিতে ফিরে যেতে বলে সরকার। মে মাসের শেষ নাগাদ তিয়েনানমান স্কোয়ারে সমবেত হওয়া বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখে।

২৪ মে বেইজিংয়ে ঢুকতে বাধা পাওয়ার পর সেনাদেরকে আরও মারাত্মক অভিযানের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে চীনা সরকার। সেইমত ৪ জুন রাত একটায় তিয়েনানমান স্কোয়ারে ঢুকে পড়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে তারা। ঘটনাস্থলেই মারা যান শত শত লোক।

চীনা বাহিনীর অভিযানের মুখে আন্দোলনকারীদের বড় অংশ পালিয়ে যেতে শুরু করলেও একটি অংশ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তারা ট্যাংকসহ সেনাদের বহন করা অনেকগুলো সাঁজোয়া যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনাবাহিনীর বহু সদস্য তাদের হাতে মারা যান।

তবে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের সামনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধ। পরদিন সকালেই হয়ে যায় তিয়েনানমান স্কোয়ার। পুরো চত্বরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সেনাবাহিনী।

৪ মে’র রাতভরের ঐ অভিযানে তিয়েনানমান স্কোয়ারের তুলনায় সেখানে ঢুকতে যাওয়ার সময় সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল বেশি। হতাহতের সংখ্যাও পার্শ্ববর্তী ঐসব এলাকায় ছিল অনেক বেশি। চীন সরকার সে রাতের অভিযানে বেসামরিক ও সামরিক মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে উল্লেখ করলেও বেইজিংয়ে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যমতে নিহতের সংখ্যা কয়েকশো থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩,০০০ পর্যন্ত হয়ে থাকতে পারে।

অসীম সাহস নিয়ে ট্যাংকের সারির সামনে সেদিন দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পড়া এই লোকটি। ছবিটি ছড়িয়ে পড়লে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান ‘ট্যাংক ম্যান’ নামে (Image: Reuters)

ট্যাংক ম্যান

অভিযান শেষে ৫ জুন সেনাবাহিনীর এক সারি ট্যাংক যখন তিয়েনানমান স্কোয়ার ছেড়ে চলে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ সেগুলোর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন নিরস্ত্র একজন মানুষ। সারির প্রথম ট্যাংকটি মোড় ঘুরিয়ে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পড়া লোকটিকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোনোর চেষ্টা করতেই লোকটিও পাশে সরে আবার ট্যাংকটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি ট্যাংকটির ওপর চড়ে ভেতরে থাকা সৈন্যদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে আবার নেমে আসেন। কিছুক্ষণ পর ট্যাংকটি আবার চলতে শুরু করলে লোকটিও আগের মত ট্যাংকটির সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন। শেষমেশ তারই মত আরও কয়েকজন সাধারণ মানুষ এসে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।

কাছের একটি হোটেল থেকে পুরো ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী করেন কয়েকজন সাংবাদিক। একঝাঁক সামরিক ট্যাংকের সামনে একজন সাধারণ মানুষের অভাবনীয় সাহস নিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে পড়ার ছবি সারা পৃথিবীতে সেসময় আলোড়ন তুলেছিল। পরিচয় না জানা সেই লোকটির নাম হয়ে যায় ‘ট্যাংক ম্যান’। ঘটনার এত বছর পর আজও জানা যায়নি সেদিনের বীরত্বের পর লোকটির ভাগ্যে কি জুটেছিল, তিনি এখনও বেঁচে আছেন কিনা কিংবা তার নামটাই বা কি!

১৯৮৯ সালের ৪ ও ৫ জুন তিয়েনানমান স্কোয়ার ও এর সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের নিন্দায় সরব হয় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সাথে এমনকি সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভও নিন্দা জানান এ ঘটনার। বিভিন্ন দেশ, জোট ও গোষ্ঠী অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সরকারের ওপর।

তিয়েনানমান স্কোয়ারের ঘটনাপ্রবাহ চীনের গণমাধ্যম, বইপুস্তক কিংবা নথিপত্রে একেবারেই অনুপস্থিত। এমনকি চীনে বসে ইন্টারনেটেও এই দিনটি নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ দেশটির সরকার এসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশকে তখন থেকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। প্রতিবছর ঐ ঘটনার বার্ষিকীতে তিয়েনানমান স্কোয়ারে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়ে থাকে।