হোমপেজ জীবনী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের জীবনী

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের জীবনী

উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪-১৯৬৫)

স্যার উইনস্টন চার্চিল ছিলেন ব্রিটেনের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি একজন সামরিক অফিসারও ছিলেন। দু’দফায় ১০ ডাউনিং স্ট্রীটের বাসিন্দা হওয়া চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দেন। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে মিত্রশক্তির বিজয়ের অনেকটা কৃতিত্ব চার্চিলকে দেওয়া হয়।

প্রথম জীবন

উইনস্টন লিওনার্ড চার্চিলের জন্ম ১৮৭৪ সালের ৩০ নভেম্বর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে। তবে বাবার কর্মসূত্রে চার্চিলের বেড়ে ওঠা ডাবলিনে। স্কুলজীবনে খুব একটা ভাল ছাত্র ছিলেননা চার্চিল। কয়েকবার স্কুল বদলের পর ১৮৮৮ সালে তিনি ভর্তি হন স্থানীয় একটি রাইফেল স্কুলে। এটিই ছিল তার পরবর্তী সামরিক ক্যারিয়ারের সূচনাস্থল।

রাইফেল স্কুলেও শুরুতে খুব একটা ভাল করছিলেননা চার্চিল। সেখান থেকে দেওয়া ব্রিটিশ রয়েল মিলিটারি কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন তিনবারের চেষ্টায়। তবে মিলিটারি কলেজে তার সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মত। গ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষায় ১৩০ জনের মধ্যে ২০তম হন চার্চিল।

সামরিক ক্যারিয়ার

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে উইনস্টন চার্চিলের ক্যারিয়ার ছিল খুব অল্প সময়ের কিন্তু ঘটনাবহুল। এসময় তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও সুদানে দায়িত্ব পালন করেন। সুদানে ১৮৯৮ সালের ওমদুরমানের যুদ্ধ সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেন চার্চিল।

সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ই ‘পাইওনিয়ার মেইল’ ও ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় সামরিক প্রতিবেদন লিখতেন চার্চিল। এছাড়া সেনাবাহিনীতে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মালাকান্ড ফিল্ড ফোর্স’ (১৮৯৮) ও ‘দ্য রিভার ওয়ার’ (১৮৯৯) নামে দু’টো বইও লেখেন তিনি।

১৮৯৯ সালে চার্চিল সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। তিনি ‘মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকায় সমর সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন। সাংবাদিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ের যুদ্ধের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরির সময় বোয়ের সম্প্রদায়ের হাতে আটক হন চার্চিল।

সেখান থেকে পালিয়ে প্রায় ৩০০ মাইল পথ পেরিয়ে পর্তুগালের অধীনে থাকা মোজাম্বিকে পৌঁছান তিনি। এই ঘটনায় ব্রিটিশ গণমাধ্যমে আলোচিত হন চার্চিল। ব্রিটেনে ফেরার পর এই অভিজ্ঞতা ‘লন্ডন টু লেডিস্মিথ ভায়া প্রিটোরিয়া’ (১৯০০) বইয়ে তুলে ধরেন তিনি।

সংসদে ও সরকারে

১৯০০ সালে ওল্ডহ্যাম থেকে কনজারভেটিভ পার্টির টিকিটে সংসদ সদস্য হন উইনস্টন চার্চিল। রক্ষণশীল দলের সদস্য হয়েও সামাজিক সংস্কার প্রত্যাশা করতেন তিনি। তা পূরণে কনজারভেটিভদের উদ্যোগে হতাশ হয়ে ১৯০৪ সালে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন চার্চিল। ১৯০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। একই সাথে ব্রিটিশ সরকারের বোর্ড অব ট্রেডের প্রধান হিসেবেও নিযুক্ত হন তিনি।

বিয়ে

১৯০৮ সালে উইনস্টন চার্চিল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ক্লেমেটাইন ওগিলভি হোযিয়েরের সঙ্গে। তাদের পাঁচ সন্তান। ডায়ানা, র‍্যানডলফ, সারাহ, ম্যারিগোল্ড ও ম্যারি। ম্যারিগোল্ড আড়াই বছর বয়সে টনসিলিটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর

১৯১১ সালে উইনস্টন চার্চিলকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রাজনৈতিক প্রধান বা ‘ফার্স্ট লর্ড অব অ্যাডমিরালটি’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯১৫ সালের শুরুতে গাল্লিপোলির নৌ যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্যের প্রাণহানির জেরে ঐ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় উইনস্টন চার্চিলকে। সেবছর শেষের দিকে সরকার থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। ১৯১৭ সালে যুদ্ধ সরঞ্জাম বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান চার্চিল। যুদ্ধে ট্যাংক, বিমান ও গোলাবারুদ উৎপাদনের দায়িত্বে ছিল তার দপ্তর। ১৯১৮ সালে শেষ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

১৯২২ সালে লিবারেল পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দে সংসদ সদ্য হিসেবে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন উইনস্টন চার্চিল। ক্ষুব্ধ হয়ে আবার কনজারভেটিভ পার্টিতে ফিরে আসেন চার্চিল।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মান বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাথিড্রাল পরিদর্শনে উইনস্টন চার্চিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

ত্রিশের দশকে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের উত্থান নিয়ে প্রতিবেশী ব্রিটেনের নেতাদের মধ্যে তেমন একটা উদ্বেগ ছিলনা। বরং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার জার্মানির নাৎসি সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপের প্রশংসা করত।

তবে ১৯৩৮ সাল নাগাদ জার্মানি এর দূর্বল প্রতিবেশীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলে সতর্ক হয়ে পড়েন উইনস্টন চার্চিলসহ ব্রিটিশ রাজনীতিকরা।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী প্রতিবেশী পোল্যান্ড দখল করে নিলে ৩ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। উইনস্টিন চার্চিলকে আবারো ‘ফার্স্ট লর্ড অব অ্যাডমিরালটি’ পদে নিযুক্ত করা হয়। এছাড়া যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভাতেও অন্তর্ভূক্ত করা হয় তাকে। ১৯৪০ সালের এপ্রিলে চার্চিলকে সামরিক সমন্বয় কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর ক’দিন পরেই জার্মানি তার আরেক প্রতিবেশী নরওয়েকে দখল করে নিলে সুযোগ থাকা স্বত্তেও তা ঠেকাতে না পারার দায়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন। পরের মাসেই পদত্যাগ করেন তিনি।

চেম্বারলিনের পদত্যাগের পরপরই ব্রিটেনের রাজা পঞ্চম জর্জ নিজ ক্ষমতাবলে উইনস্টন চার্চিলকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।

এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই নিজেদের পশ্চিম সীমান্তে থাকা নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গও দখল করে নেয় জার্মানি। তার দু’দিন পর ফ্রান্সেও ঢুকে পড়ে তারা। ইউরোপের বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাৎসি বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় চার্চিলের ব্রিটেনকে একা হিটলারের জার্মানির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির তিন শীর্ষনেতা: সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিক রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল

যুদ্ধে ব্রিটেন

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই লেবার, লিবারেল ও কনজারভেটিভ, সব দলের নেতাদের নিয়ে জোট সরকার গঠন করেন উইনস্টন চার্চিল। মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসান তিনি। ১৯৪০ সালের ১৮ জুন সংসদে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক এক ভাষণে চার্চিল সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ব্যাটেল অব ব্রিটেন’ (ব্রিটেনের যুদ্ধ) শুরু হতে যাচ্ছে। শক্তিশালী নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্বপ্ন জিইয়ে রাখেন তিনি। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধকালীন জোট গঠনের ভিত্তিও উইনস্টন চার্চিল তৈরি করে দেন।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জার্মানির মিত্র জাপান পার্ল হারবার বন্দরে বিমান হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়। চার্চিল আরও নিশ্চিত হয়ে যান যুদ্ধে তাদের বিজয়ের ব্যাপারে। পরবর্তী মাসগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও সোভিয়েত নেতা স্তালিনের সাথে যুদ্ধকালীন জোট গঠনের ব্যাপারে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

১৯৪৫ সালের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ঘোষণার পর জনতাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল

চার্চিলের প্রচেষ্টায় জার্মানি, জাপান ও ইতালির জোট ‘অক্ষশক্তি’ (অ্যাক্সিস পাওয়ার) এর বিরুদ্ধে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জোট ‘মিত্রশক্তি’ (অ্যালাইড পাওয়ার) এর জন্ম হয়। অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে তাদের সমন্বিত লড়াইয়ে ছয় বছর ধরে চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৪৫ সালের ৭/৮ মে জার্মানি ও ২ সেপ্টেম্বর জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।

যুদ্ধজয়ে বীরের মর্যাদা পেলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের পুনর্গঠনে তার নেওয়া পরিকল্পনার পেছনে নিজ দেশে জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন উইনস্টন চার্চিল। যুদ্ধে জার্মানির আত্মসমর্পণের দু’মাসের মাথায় ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত ব্রিটেনের সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয় বরণ করেন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও তার দল কনজারভেটিভ পার্টি।

তবে পরের ছয় বছর শক্তিশালী বিরোধী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠীত করেন উইনস্টন চার্চিল। ১৯৫১ সালের সংসদ নির্বাচনে আবারও জয়ের মুখ দেখে কনজারভেটিভরা। আরও একবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন চার্চিল।

১৯৫৩ সালের ২৩ জুন গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন উইনস্টন চার্চিল। তার একপাশ অবশ হয়ে যায়। কয়েক মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফেরেন চার্চিল। তবে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তার পক্ষে আগের মত পূর্ণোদ্যমে কাজ করা আর হয়ত সম্ভব হবেনা। সেইমত ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান চার্চিল।

রাণী এলিজাবেথের সাথে উইনস্টন চার্চিল। ছবিতে ছোট্ট প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস অ্যানকেও দেখা যাচ্ছে

নোবেল ও নাইটহুড

১৯৫৩ সালে ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ বেসমারিক সম্মাননা ‘নাইটহুড’ প্রদান করেন। তার নামের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয় ‘স্যার’ উপাধি। একই বছর ‘ঐতিহাসিক ও জীবনীমূলক রচনায় অসামান্য দক্ষতা ও উন্নত মানবিক মূল্যবোধ বর্ণনায় উৎকৃষ্ট বাগ্মিতার’ স্বীকৃতিস্বরূপ সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয় চার্চিলকে।

মৃত্যু

১৯৬৫ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্যার উইনস্টন চার্চিল। শোকে ম্যূহমান হয়ে পড়ে পুরো ব্রিটেন। সাতদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয় দেশজুড়ে।

সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য চার্চিলের মরদেহ তিনদিন শায়িত রাখা হয় ওয়েস্ট মিনিস্টার হলে। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে অনুষ্ঠিত হয় তার শেষকৃত্য। এরপর নিজ জন্মস্থানের কাছে ব্ল্যাডোনে সেন্ট মার্টিনস চার্চের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয় উইনস্টন চার্চিলকে।

রাজনীতির পাশাপাশি উইনস্টন চার্চিল পরিচিত ছিলেন ছবি আঁকা ও লেখালেখির জন্যও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসামান্য নেতৃত্ব ও পারিপার্শিক গুণাবলীর জন্য ব্রিটিশ সমাজে তার প্রভাব এখনও ব্যাপক। ২০০২ সালে বিবিসি পরিচালিত জরিপে শেক্সপিয়ার, ডারউইন থেকে শুরু করে প্রিন্সেস ডায়ানা কিংবা রাণী এলিজাবেথকেও পেছনে ফেলে ‘সর্বকালের সেরা ব্রিটিশ ব্যক্তিত্ব’ নির্বাচিত হন স্যার উইনস্টন চার্চিল।