Home বিজ্ঞান মারা গেল সর্বশেষ পুরুষ নর্দান সাদা গন্ডারটিও

মারা গেল সর্বশেষ পুরুষ নর্দান সাদা গন্ডারটিও

মারা গেছে দূর্লভ নর্দান সাদা গন্ডারের সর্বশেষ পুরুষ সদস্যটি। কয়েকমাস ধরে একাধিক শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গত সোমবার মারা যায় গন্ডারটি। ৪৫ বছর বয়সী ‘সুদান’ নামের গন্ডারটি গত কয়েক বছর ধরে কেনিয়ার ওল পেজেটা প্রাণী সংরক্ষণাগারে বাস করছিল। গত সোমবার গন্ডারটির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল।

সুদানের মৃত্যুর সাথে সাথে দূর্লভ প্রজাতির এই নর্দান সাদা গন্ডারের সংখ্যা কমে দাড়াল দুইয়ে। অবশিষ্ট দুটো গন্ডারই মেয়ে, তাদের নাম নাজিন (২৭) ও ফাতু (১৭)। সুদান ছিল এই গোত্রের শেষ পুরুষ সদস্য। নাজিন আর ফাতু দুজনেই আবার সদ্যপ্রয়াত সুদানেরই বংশধর।

কেনিয়ায় আনার আগে সুদানের ঠিকানা ছিল চেক প্রজাতন্ত্রের ভুর ক্রালোভ চিড়িয়াখানা। সেখানকার একজন কর্মকর্তা জ্যান তেজস্কাল সুদানের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে মন্তব্য করেন, ‘সুদানের মৃত্যু প্রকৃতির প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতার একটি প্রতীক মাত্র। সুদানকে যারা চিনত তার মৃত্যু তাদের সবাইকেই শোকাহত করেছে।’ বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমাদের হাল ছাড়লে চলবেনা। আমাদের উন্নত প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করতে হবে বিলুপ্তপ্রায় বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা জীবপ্রজাতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য।’

কিভাবে এই গন্ডারগুলো এতটা দূর্লভ হল?

পৃথিবীতে হাতির পরেই সবচেয়ে বড় স্থলজ প্রাণী গন্ডার। বিশালাকার এই প্রাণীটির মোট পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে। সাদা গন্ডার তার অন্যতম। এটিও আবার নর্দান ও সাউদার্ন এই দুই উপ-প্রজাতিতে বিভক্ত। সাউদার্ন গন্ডারগুলো এখনও ঝুঁকির মুখে না পড়লেও, নর্দান প্রজাতি রয়েছে বিলুপ্তির আশংকায়। সোমবার পর্যন্ত এদের সংখ্যা ছিল তিন, সুদানের মৃত্যুতে যে সংখ্যাটি এখন দুই।

২০১৪ সালে তখনকার দ্বিতীয় সর্বশেষ নর্দান সাদা গন্ডারের মৃত্যুর পর সুদানই হয়ে পড়েছিল গন্ডারের এই উপ-প্রজাতির একমাত্র পুরুষ সদস্য। মূলত ৮০ ও ৯০ এর দশকে উগান্ডা, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, সুদান এবং চাদে এই প্রাণীগুলোকে যথেচ্ছ নিধনের কারণেই আজ এদের সংখ্যা এমন ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। ইয়েমেনের বিশেষ এক ধরনের ছোরার হাতল এবং চীনের কিছু ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরিতে গন্ডারের শিং ব্যবহার করা হত। এই কারণেই চোরাশিকারিদের হাতে সেসময় গণহারে মারা পড়ত গন্ডারগুলো।

বিগত দশকের প্রথমার্ধে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে চোরাশিকারিদের হাতে বেশ কয়েক ডজন নর্দান সাদা গন্ডারের মৃত্যুর পর একে ঝুঁকিপূর্ণ বন্যপ্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

কিভাবে মারা গেল সুদান?

গত কয়েকমাস ধরে সুদান বেশকিছু শারীরিক জটিলতায় ভূগছিল। পেশি আর হাড় অকার্যকর হতে থাকা ছাড়াও সুদানের ত্বকে দেখা দিতে শুরু করে ক্ষত। শেষ দিনগুলোতে সুদান নিজে থেকে দাড়াতেও পারছিলনা। মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা আগে তাকে পশুচিকিৎসকদের নিবিঢ় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

সুদানের মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

সুদানের মারা যাওয়ার খবর খুব দ্রুতই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কেনিয়ার রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ, বিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, ইউটিউবারদের শোকবার্তায় ভরে যায় সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা। অনেকেই বিভিন্ন সময়ে তোলা সুদানের সাথে তাদের ছবি পোস্ট করে সুদানকে স্মরণ করেন। সাবেক রেসলার ড্যানিয়েল ব্রায়ান #wedidthis হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে জানান তার শোক আর ক্ষোভ। পরিবেশবাদীরা আরও জোরালো কন্ঠে বিশ্বের সব সরকার ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বিপন্ন প্রাণীগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

কতটুকু সম্ভাবনা আছে এই প্রজাতির গন্ডারকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার?

২০০৯ সালে তখনকার অবশিষ্ট চারটি নর্দান সাদা গন্ডারকে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কেনিয়ায় স্থানান্তর করে আনা হয়। সুদানসহ দু’টি পুরুষ আর দু’টি স্ত্রী। ধারণা করা হয়েছিল, আফ্রিকার নিজস্ব পরিবেশে গন্ডারগুলো মিলিত হতে ও প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও বিজ্ঞানীদের হতাশ করে গন্ডারগুলো। উপরন্তু চার বছর আগে সুদানের মিলনক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করা হয়।

গত বছর জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ ‘টিন্ডার’-এ সুদানের জন্য অ্যাকাউন্ট খোলা হলে চারিদিকে সাড়া পড়ে যায়। অবশ্য সুদানের সঙ্গী খোঁজার জন্য অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়নি, উদ্দেশ্য ছিল গন্ডারদের জন্য ব্যয়বহুল আইভিএফ কর্মসূচীর তহবিল সংগ্রহ করা। তবে এতেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিত পায় সুদান।

আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) হল প্রজননে অক্ষম প্রাণীদের শরীর থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে কৃত্রিম উপায়ে সেগুলোর সংযোগ ঘটিয়ে নতুন প্রাণের সৃষ্টি করা। সুদানের মৃত্যুর আগেই তার শরীর থেকে প্রয়োজনীয় প্রজনন উপাদান সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যৎে কখনো এই উপাদান থেকে নাজিন বা ফাতুর সাহায্য নিয়ে নর্দান সাদা গন্ডারের নতুন সদস্যের জন্ম দেওয়া সম্ভব হবে।